একাত্তরের স্মৃতিকথা

শিল্পী ভট্টাচার্য

৭১’এর রক্তাক্ত ইতিহাস বহন করছে বেশির ভাগ পরিবার কিন্তু সবার কথা আমরা জানিনা। আমাদের পরিবারের সেই রক্তক্ষরণের কথা আমার মায়ের কাছে শোনা, কারণ আমি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম। রাতের আধাঁরে চেনা চেনা মানুষগুলো মুখে কেউ গামছা, কেউ চাদরে ঢেকে বাড়ি বাড়ি থেকে লোক উঠিয়ে নিতে লাগলো। আমার বাবা-মা তাঁদের স্পষ্টতঃ চিনে ফেলেছিলেন,কার নাকি গামছাও খসে পড়ে মুখ থেকে। উঠিয়ে নিয়ে গেলো আমার বাবা নৃপেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য নিরীহ সৎ ব্রাহ্মণ পন্ডিত মানুষ, যিনি বাংলা ব্যাকরণ আর সংস্কৃতে ডবল এম এ পাশ করেছিলেন গোল্ড মেডেল সহ। আর উঠিয়ে নিয়ে গেলো আমার কাকাকে,কাকা ফনীন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য। বাবার নামে মিথ্যা বানোয়াট দেশদ্রোহী মামলা হলো। জেল হাজতে বাবাকে নির্যাতিত হতে হয়েছে নির্মমভাবে। বাবার বিরুদ্ধে মামলা হলো,তারিখের পর তারিখ পড়লো,কোন সুরাহা হয়না। পরে বাবাকে ১মাস ৫ দিন পর ছাড়িয়ে আনা গেল কিছু সুহৃদ মানুষের সহায়তায়।  সেক্ষেত্রে পরম শ্রদ্ধেয় আজিজ মোক্তার কাকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। মা ছুটে যেতেন উনার কাছে বাবাকে ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার কাকাকে আমরা আজও খুঁজে পাইনি- জীবিত বা মৃত। কাকাকে যে রাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মধ্যরাতে সেই রাতেই নাকি অখিল সেন, হেম সেন,আলোকদার বাবাসহ আরো অনেককেই উঠিয়ে নেয়া হয়। আমার কাকার বয়স কম। সরকারী চাকরী করতেন,নীরিহ শান্ত মানুষ। সে’রাতে সেই যে কাকাকে উঠিয়ে নিলো কোন খবর আজও আমরা জানিনা। নেত্রকোণা শহরের কেউ জানে বলে আমরা আজও শুনিনি। আমার কাকীমা ১২ বছর শাঁখা-সিঁদুর ধারণ করেছেন স্বামীর পথ চেয়ে। বাবা জেল থেকে ছাড়া পাবার পর আমাদের পরিবার আমাদের সাতপাই-এর বাসা ছেড়ে তখন আমার এক কাকার বাড়ি শিবনগরে আশ্রয় গ্রহণ করে। শিব নগরে আশুকাক্কু বাবাকে রীতিমতো জোড় করে সেখানে নিয়ে যান। বাবা শিবনগর থেকে রোজ এসে মোক্তারপাড়ার ব্রীজের নীচ থেকে নদীর ধার ধরে দিনের পর দিন কাকার লাশ খুঁজে ফিরেছে  অনেক লাশের ভিড়ে।

 বাবা যেহেতু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেলো তাই রাজাকাররা বাবার খোঁজে, বাবাকে মেরে ফেলার জন্য শিবনগর পর্যন্ত ধাওয়া করে বেশ কয়েকবার। তারপর একদিন শিবনগরের সেই বাড়ি-ঘর, ধানের গোলা সব জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আমাদের পরিবার, আশুকাক্কুর পরিবার পাটক্ষেতে লুকিয়ে, বিলে ডুবে জীবন রক্ষা করেন কোন রকম। পরে বাগমারা হয়ে নিঃসম্বল হাতে তারা বহুকষ্টে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। আমার কাকা ময়মনসিংহ কালেক্টরী অফিসে চাকরি করতেন। কাকার সরকারী কার্ড ছিলো, সে নিয়মে কাকাকে তো এ্যারেস্ট করা বা উঠিয়ে নেবার নিয়ম নাই। কিন্তু এই নির্মম পরিণতির শিকার হতেই বুঝি কাকা সেদিন ময়মনসিংহ থেকে নেএকোণা এসেছিলেন, ঐদিনই সন্ধ্যায়।  মায়ের কাছে শুনেছি কি নির্মমভাবে গরুরগাড়ীর পিছনে বেঁধে আলোকদার বাবাকে সারা শহর ঘুরিয়েছে। পরদিন,কি নিদারুণ কষ্ট দিয়েছে উজ্জ্বল কাক্কুর জ্যেঠামশাইকে। আমার বাবার নামেই ছিলো উনার নাম। সেদিন রাতে নাকি অখিল সেন,হেম সেনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ১১টা ফায়ারিং এর বিকট আওয়াজে সারা শহর কেঁপে ওঠে ! তাহলে কি আমার কাকা-কেও সেদিনই গুলি করে মেরে ফেলা হয় ব্রীজের উপর নিয়ে গিয়ে! সেদিন ছিলো ১৪ই আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। স্বজন হারানোর ব্যথা তারাই বোঝে যারা স্বজন হারায়। মা বলতেন, আজিজ মোক্তার (শফী আহমেদ এর বাবা) না থাকলে বাবাকে নাকি বাঁচানো যেতোনা সেদিন। মা ছুটে গেছেন ডাঃ হামিদ কাকার কাছে,অছিমুদ্দিন সাহেবের কাছে। আমার নিষ্ঠাবান বাবা জেল হাজতে দানা পর্যন্ত মুখে তুলতেননা। 

খেয়ে না খেয়ে,শারিরিক মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও বেঁচে ছিলেন আমার বাবা। কোন সম্মাননা,কোন স্বীকৃতি, কোন সংবর্ধণা বেঁচে থেকে স্বাধীন দেশে আমার বাবা পাননি। শহীদ হয়ে আমার কাকাও পাননি। শুধু হায়দার জাহান চৌধুরীর লিখা ‘মুক্তিসংগ্রামে নেত্রকোণা” নামক বইয়ে ১১৮ নাম্বার পৃষ্ঠায় আমার এই স্মৃতিময় লিখাটি ছাপার অক্ষরে স্থান পেয়েছে। 

0

Subtotal