আনোয়ার হাসান
“ এটা এমন কোনো কঠিন বিষয় না। বুড়াপীরের মাজারে গেলেই মিরাসের মা-কে পাওয়া যায়। আপনি এক্ষুনি যান। আপনারা বিষয়ের গুরুত্ব বুঝেন না। একটা মহান সুযোগ। এমন সুযোগ সবসময় আসে না। কানে ঢুকলো কিছু ?”
বড়কর্তা রেগে গেলেন। বসের ধমক খেয়েও আলাউদ্দিন মিয়ার ডিমা তেতালা ভাবগতির খুব যে হের- ফের ঘটলো এমন বোধ হলো না। লোকটা এ রকমই। তবে বড় কর্তা হঠাৎ হঠাৎ চটে গেলেও তার উপর বড় নির্ভর করেন। বসের মর্জি মাফিক কাজ করার দক্ষতা তার আছে। একটু ধীর প্রকৃতির হলেও বুঝে শুনে কাজ করেন। বড় কর্তার চেয়ে বয়সে বড় হবেন। থুতনির দিকে বর্শার ফলার মতো নিম্নগামী হয়ে ঝুলে থাকা কাঁচা-পাকা একগুচ্ছ লম্বা দাড়ি এরই ইশারা বহন করে। মাথায় টুপি না থাকলেও কপালের ঠিক মাঝখানটায় নামাজি মুসল্লির যে রকম থাকে, সে রকম টিকার মত কালো দাগ ফুটে রয়েছে, যা তাকে সবসময় একটা ভক্তিপূর্ণ মাননীয় আদল দিয়ে রাখে। আলাউদ্দিন মিয়া ভালোই বুঝেন, এ সব সেনসিটিভ ইস্যু। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতায়, তবে বসকে বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের উদ্বিগ্ন দেখে ভেতরে ভেতরে তিনি কিছুটা বিরক্ত- এই যা। বিরক্ত হবেন নাইবা কেনো ! সেই উনিশশ একাত্তর সালে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন যুদ্ধে কোন যুবতী নারীর ইজ্জত গেলো, নাকি বন্ধুক নিয়া যুদ্ধ করলো এতোদিন পর এর কি মূল্য আছে ! তাও ভদ্র ঘরের কোনো মেয়ে-ছেলে হলে কথা ছিলো। বুঝলাম সংগঠনের ইজ্জত বাড়বে। তাতে আলা উদ্দিন মিয়ার কি এসে যায় ? তার বেতন কি এক টাকা বাড়বে ? যত্তসব আহম্মকি কান্ডকীর্তি ! না না না না ! এসব বিষয়ে বিরক্ত হলে তো চলবে না। অনুষ্ঠানে যখন এম পি মহোদয় স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন।
আরে স্বাধীনতার প্রায় আঠাশ বছর পর একজন বীরাঙ্গনার আবিস্কার কি সামান্য ঘটনা ! না না আলা উদ্দিন মিয়া, আপনি কখন বিরক্ত হন আর কখন খুশী হন না বললেও আমি আন্দাজ করতে পারি ষোল আনা-মনে মনে বড় কর্তার ভাবনা এরকমই। তিনি স্থির দৃষ্টিতে কড়া ভাব অংকিত করে আলা উদ্দিন মিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আলা উদ্দিন মিয়া বসের চোখের ভাষা বুঝতে পারেন। সুতরাং আর দেরি করা চলে না। বুড়াপীরের মাজার একটা পরিচ্ছন্ন জঙ্গলই বলা চলে। বৃক্ষরাজির ছায়ায় জায়গাটা বড় নিরিবিলি। জঙ্গলের মাঝ খানে বিশাল একটা পুরাতন বৃক্ষের ছায়ায় বুড়াপীরের পাক্কা কবর লাল শালুতে আবৃত। বৃষ্টি এড়ানোর জন্য চার চারটি পিলারের উপর ভর করে চাঁদুয়ার মতো পাকা ছাদ আলা উদ্দিন মিয়ার প্রথমেই চোখে পড়ে এবং এই প্রাচীন মাজারের প্রতি সমীহ জাগানো ভয়ও কাজ করে তার মধ্যে। যদিও তিনি মাজারের কেরামতিতে বিশ্বাস রাখতে পারেন না। মাজারের দক্ষিণ পাশে কয়েকটা আম গাছের ছায়ায় একটা জীর্ণশীর্ণ কুঁড়ে লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরটা পরখ করে দেখার জন্য একটু দাঁড়ান। জায়গাটা ধোঁয়াময় অন্ধকার মনে হলেও গাঁজার উৎকট গন্ধ এসে নাকে সুরসুরি দিয়ে মানুষের উপস্থিতি বোধগম্য করে তুলে। লোকজনের কাছে শুনে মীরাসের মা সম্পর্কে তার যে ধারণা, তা মুটেও সুবিধার নয়। দীর্ঘদিন দেশান্তরি ছিলো, কয়েক মাস আগে বুড়াপীরের মাজারের এই পরিত্যক্ত ঘরটিতে আশ্রয় নিয়েছে। শোনা যায় আবু হান্নান নামের এক উদ্যোমী যুবক শাহ আরেফিনের মাজার থেকে ধরে এনে এখানে থিতু করেছে তাকে। কোনো গাঁজাখোর ছাড়া তার হুদ্রায় কেউ আসে না সাধারণত। চারপাশের জনমানুষের কাছে মিরাসের মা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নয় বরং সমাজচ্যুত, পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো ঘৃণিত এক নারী মাত্র।
মানুষের শোনা কথায় আলা উদ্দিন মিয়া যা ভয় পেয়েছিলেন তাই ঘটলো। প্রথমে তো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। হাড্ডিসারকালাকিস্টি মিরাসের মা একান্ত মনে গাঁজার কলকী টেনেই চলেছে। পুরুষের ভঙ্গিতে দুই হাতের তালুর মধ্যে সরু কলকিটি প্রণামের মতো চেপে ধরে কুচকি কুচকি টানের পর যখন বড় করে টান দেয় তখন তার কালো গন্ডদ্বয়ের দুইপাশ ভেতরে ঢুকে গিয়ে দুটি গর্ত তৈরী করে এবং সঙ্গে সঙ্গে পট পট আওয়াজ তুলে কলকির মুখে দপ করে আগুন জ¦লে উঠে। এরপর হা করে ধোঁয়া ছাড়ে। আর ধোঁয়ায় আড়াল হয়ে পড়ে তার মুখমÐল। ঘরজুড়ে ভদ্রলোকর বসার মতো কোনো ব্যবস্থাতো নাই-ই কোনো মানুষ মাটিতে, খড় বিচালির মধ্যে এমন বিশ্রীভাবে বাস করতে পারে আলা উদ্দিন মিয়ার ভাবতেই ঘেন্না লাগছে। যা হউক, আলা উদ্দিন মিয়া যখন তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সংবর্ধনার কথাটা জানালেন, মিরাসের মা শুনে একেবারে টাসকি মেরে গেলো। গাঁজার কলকিটি ঠোঁট থেকে আলগা করে নিয়ে আলা উদ্দিন মিয়ার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর বকাঝকা শুরু হয়। আলা উদ্দিন মিয়া কোন্ ছার ! বড় কর্তাসহ মেম্বারচেয়ারম্যান-এমপিসহ পুরু সমাজকেই একচোট বকে নিলো। বুড়ির তেজ দেখে আলা উদ্দিন মিয় ভরকে যায়। ভাবে, ফিরে গেলেই ভালো হয়। কিন্তু তার অহঙে আঘাত লাগে, সামান্য একটা ফকিরনীর কাছে মাথা হেট হবে আজ ! বসের আদেশ বলে কথা। তিনি নিস্তব্ধ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বুড়িকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ছোট্ট কুঁড়ের চারদিকের ভাঙ্গাচূরা বেড়া ছেদ করে বাইরে থেকে দিনের টুকরো টুকরো তীর্যক আলোক রেখা ঢুকে নোংরা বুড়িকে টিটকারি দিচ্ছে, না কি তাকে, বুঝতে পারছেন না। এই বোধগম্যহীনতার মধ্যে আলা উদ্দিন মিয়ার মনের ভাবগতি কেমন নরম হয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বুড়ির কাছে গিয়ে বসেন। উৎকট গন্ধটা অগ্রাহ্য করে তার ঘোলা চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি পুনরায় বলেন,‘তুমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমরা তোমাকে সম্মানিত করতে চাই। বুড়িও তখন কি মনে করে আর রেগে যায় না বরং আলা উদ্দিন মিয়ার থুতনির নিচে কুঁচের ফলার মতো দাড়িগুচ্ছের মৃদু কম্পন কেমন সম্ভ্রমের সাথে উপভোগ করে। আর তার কোটরাগত দু’চোখ ভরে উঠে অশ্রæতে।
সেইবিগলিত অশ্রæ শুকনো গাল বেয়ে টপ টপ করে পড়তে থাকে। বুড়ি তখন একাত্তরের যুদ্ধের দিনগুলোর কথা ভাবে। থানার জমাদার সাব, যার বাসায় সে কাজের ঝি হিসেবে কর্মরত ছিলো ; যিনি থানায় অকস্মাৎ পাকবাহিনীর আগমন বার্তা টের পেয়ে মিরাসের মাকে তার নবজাত শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধেই চলে গেলেন কি না জানা নেই, আর ফিরে এলেন না। আর সেই গুরু দায়িত্ব পালনে তার চরম অক্ষমতার কথা স্মরণ হলে এখনও দারুণ কষ্টে ভেতরটা ফেটে যায়। ভাবে, সেতো এদেরকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেনি সেদিন। ধরা পড়ে গেলো। আর তার চোখের সামনে কুলাঙ্গার বাহনীর একটা বজ্জাত পশু শিশু সন্তানটিকে মায়ের কোল থেকে হেচকা টানে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। শিশুটির চিৎকারও শোনা গেলো না পর্যন্ত, এখানেই খতম ! অতপর পিশাচের দল যুবতী শিশুমাতাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে মেরেই ফেলে এবং নিজেও ধর্ষিতা হয়। মিরাসের মা ভাবে, সে কেমন করে বুকের মধ্যে প্রতিশোধের তীব্র আগুন লুকিয়ে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিশে গিয়ে সশস্ত্র সংগামের সহযোগী হয়েছিলো সেইসব মর্মান্তিক কথা ! অথচ দেশ যখন স্বাধীন হলো, হানাদার মুক্ত হলো, তখন দেখে দেশ হয়ে গেলো ভদ্রলোকদের বাপ-দাদার সম্পত্তির মতো। যেখানে আদতে গরীবের স্থান অতি সামান্য। সে আরো বিস্মিত হয় যখন সে তার একমাত্র পুত্র এবং স্বামীর কাছে নির্মমভাবে পরিত্যক্ত হয়। সেভাবে, কেমন করে ক্রমেই সমাজচ্যুত হয়ে পড়েছিলো সেদিন। কেমন করে দেশ-বিদেশ ঘুরে শেষে তার বাড়ির পাশে এই বুড়াপীরের মাজারে আশ্রয় পেলো। এসবই তার ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। তার জবান একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। আলা উদ্দিন মিয়া বুড়ির অন্তর্গত জগতের কোনো খুঁজই পেলেন না বরং আরেক বিপদে পড়ে গেলেন । সে তো কথাই বলছে না এখন। অনুষ্ঠানের কি হবে। তার বসকেই কি জবাব দিবে। আলা উদ্দিন মিয়া তখন ধৈর্য ধরে অনেক অনেক আশার কথা শোনাতে থাকেন।সে নির্বাক হয়ে শিকারীর খাঁচায় বন্দি বাঘিনীর মতো কেবল পিট পিট করে তাকায়। আলা উদ্দিন মিয়া খেয়াল করে দেখে মিরাসের মার পরনের শাড়ীটি যাচ্ছে তাই নোংরা এবং ছেঁড়া ফাড়া। তখন একটা নতুন শাড়ীর ভাবনা আসে তার মাথায় এবং বলেন, “বুঝতে পেরেছি অনুষ্ঠানে যেতে হলে তোমার তো একটা শাড়ী লাগবে। একটু অপেক্ষা করো আমি এখনই নিয়ে আসছি।”
আলা উদ্দিন মিয়ার কাছে এই মুহূর্তে একটা নতুন শাড়ীই বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হলো এবং তা মিটে গেলেই সব সমস্যা মিটে যায়। সুতরাং তিনি শাড়ী আনতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। যেতে যেতে শুনলেন বুড়ি বলছে , “অতদিন পরে তোমরা কি আমারে সঙ সাজাইতা চাও ?” কথাটা বুদ বুদের মতো উড়ে ,উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। ঘন্টা খানেক পরে নতুন শাড়ী নিয়ে আলা উদ্দিন মিয়া যখন ফিরে এলেন, মিরাসের মা-কে আর খুঁজে পেলেন না।