বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন তালুকদার

গবেষক আহমেদ সামির

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন তালুকদার ছিলেন একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, স্বনামধন্য শিল্পপতি ও সমাজসেবক। তিনি ৬ষ্ঠ, ৭ম, ও ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোণা-৩ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জন্ম : বীর মুক্তিযোদ্ধারা নুরুল আমিন তালুকদার নুরুল আমিন তালুকদার ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালে আটপাড়ার দেওশ্রী গ্রামের তালুকদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল মৌলা তালুকদার ও মাতার নাম খুর্শেদা মৌলা তালুকদার। ১৯৭৫ সালের ১১ আগস্ট তিনি শিল্পপতি গোলাম কাদেরের বড় মেয়ে খাদিজা কাদেরকে বিয়ে করেন। তাদের ৩ ছেলে হয়েছিল রায়হান আমীন রনি, ফারহান আমীন রবিন এবং আদনান আমীন ইভান।

শিক্ষা ও কর্মজীবন: ১৯৬০ সালে তিনি জাহাঙ্গীরপুর টি আমীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এম.এ. প্রথম পর্বে পড়ার সময়ে তিনি সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (পুলিশ) যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি ১৯ জুন ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে যোগ দেন এবং জাতীয় কমিটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তালুকদার ১৯৯৬ সালে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১,০৩,১২৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। ৭ম জাতীয় সংসদের পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আবারও অংশগ্রহণ করেন এবং ৭০,৯৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তালুকদার একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি রেইনবো গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন তালুকদার ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক হিংসা বিদ্বেষের অনেক উর্ধে ছিলেন। ছিলেন ভিন্ন মতাদর্শ ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এ বিষয়ে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক,প্রাবন্ধিক  অধ্যাপক ননী গোপল সরকারের “স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী “-প্রবন্ধতে উদ্ধৃত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চিত্রবাংলা-র সাংবাদিক জনাব রুহুল চৌধুরীর লিখা থেকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, রেইনব গ্রুপ অব ইনডাষ্টিজের মালিক,সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন তালুকদারের হল রুমে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তুলে ধরা হল:

“১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে জনাব তালুকদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল, ঢাকা মেডিকেল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল,জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেত্রকোণার ছাত্রছাত্রীদেরকে আমন্ত্রণ জানান। সেই সভায় ডাকসু,জাকসু,ঢামেকুসহ সকল দলের ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিলেন। জনাব তালুকদার হলে আসার পর পরিচয় পর্ব শুরু হয়। পরিচয় পর্বের এক পর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা  শহীদ মেহের আলীর ছেলে এম কে জামান(বর্তমানে  অস্ট্রেলীয়াতে সফল ইন্জিনীয়ার  এবং অধ্যাপনায় নিযুক্ত আছেন) তার পরিচয় দেয়। তখন জনাব তালুকদার বলেন, ” তার আরেকটা পরিচয় আছে। সে আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় মেহের আলী ভাইয়ের ছেলে। মেহের আলী ভাই নেত্রকোণার রাজনীতির এক উজ্জল নক্ষত্র।ষাটের দশকে যখন পুর্বপাকিস্থানে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল তখন তিনি ছাত্র সংস্থা নামে একটি গোপন সংগঠন গড়ে তুলেন।এই সংগঠনে অন্যরা যারা ছিলেন- সর্বজনাব মো: শামছুজ্জোহা, গাজী মোশারফ হোসেন, জামাল উদ্দিন আহমেদ,বিপ¬ব চক্রবর্তী, নুরুল ইসলাম,লুৎফর রহমান খান,আব্দুস সাত্তার  প্রমুখ ছাত্রনেতা।পরবর্তিতে তিনি জোহা ভাইকে নিয়ে জেলা ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। মেহের আলী ভাইয়ের নেতৃত্তে আমরা সরকার বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলি। জনাব তালুকদার বলেন , এই সময়ে জনাব ফজলুর রহমান খান ছাড়া যত রাজনীতিবিদ নেত্রকোণায় আছে মেহের আলী ভাই সকলের রাজনৈতিক গুরু। তিনি আমাদেরকে রাজনীতি শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যদলের নেতাদের সাথে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। তিনি ষাটের দশকের প্রতিটি আন্দোলনে নেতৃত্ত দিয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে সকল নেতাকর্মী তার কাছে ছুটে যেত পরামর্শের জন্য। তার মত নেতা আজকের সমাজে বিরল।“  ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি এমন সম্মান জ্ঞাপনের ঘটনা আজকের সমাজে বিরল।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি,নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”-এর লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা- সহ-সভাপতি,মহেষখলা সাব-সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল- নেত্রকোণার সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা” বইতে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন তালুকদার সম্পর্কে লিখেছেন 

আমি যখন আমার গ্রামের বাড়ী সোনাজুরে অবস্থান করছিলাম তখন একদিন খবর পেলাম ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আটপাড়া দেওশ্রী গ্রামের নুরুল আমীন তালুকদার গ্রামের বাড়ী দেওশ্রীতে এসেছেন। তিনি এসে জানতে পারলেন আমি আমার দলবল নিয়ে এলাকায় কাজ করছি। এ সময় আমি এলাকার ছাত্র যুবকদের নিয়ে আমাদের পাশের গ্রাম মধুয়াখালীতে ছাত্রলীগ কর্মী শীতাংশু বিকাশ আযার্চ্য চৌধুরীদের বাড়ীর বৈঠকখানায় ছাত্রলীগের একটি অস্থায়ী কার্যালয় বানিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আটপাড়া, মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও কেন্দুয়া এলাকার ছাত্র যুবকদেরকে সংগঠিত করে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। একদিন সকালে নাজিরগঞ্জ বাজারে চায়ের দোকানে বসে এলাকার ছাত্র যুবকদেরকে নিয়ে সাংগঠনিক আলোচনা করছি এমন সময় দেওশ্রী গ্রামের রফিক এসে আমাকে খবর দিল পুলিশ অফিসার নুরুল আমীন ভাই আমাকে তার সাথে দেখা করার জন্য বলেছেন। নুরুল আমীন ভাই আমার পূর্ব পরিচিত, ছোট বেলা থেকেই তিনি আমাকে জানতেন এবং স্নেহ করতেন। বিশেষ করে আমি যখন  ঢাকায় খেলতাম প্র্য়াই নুরুল আমীন ভাইয়ের সাথে তার কর্মস্থলে যেতাম। ঢাকা ষ্টেডিয়াম মাঠেও আমার সাথে দেখা হত। খবর পেয়ে রাতে আমি ও আমার দুই  সহকর্মী  নিয়ে নুরুল আমীন ভাইয়ের বাড়ী দেওশ্রী গ্রামে যাই। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমীন ভাই আমার কাছে জানতে চান আমার নিকট কি কি অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে, আমার সংগে তিনটি রাইফেল ও দুইটি বন্দুকসহ বেশ কিছু গোলাবারুদ আছে, তখন তিনি বলেন আমি মদন থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা সোলাইমান সাহেবের নিকট খবর পাঠিয়েছি আমাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য সেই সাথে থানার সব অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যদেরকে  নিয়ে ভারতে মহেষখলা যাবার জন্য। সে দু-একদিনের  মধ্যে আমাকে তার সিদ্ধান্ত জানাবে। যদি রাজী হয় তবে ভালো, রাজী না হলে আমি তোমাদের সহযোগিতায় মদন থানা লুট করে সব অস্ত্র,গোলাবারুদ কেড়ে নিব। এতে আমাকে তোমরা কি রকম সাহায্য সহযোগিতা দিতে পারবে? আমি তখন নুরুল আমীন ভাইকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলি দেখুন ওরা তো আমাদের মতোই বাঙ্গালী, আমার মনে হয় ওরা আপনার প্রস্তাবে রাজী হবে। আমার অনুমানেই সত্য হলো । পরদিন জানতে পারলাম মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সকল পুলিশ সদস্য থানার সব ক’টি অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে নুরুল আমীন ভাইয়ের সঙ্গে ভারতে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুল আমীন তালুকদারের বাড়ীতে এসে ভারতে যাওয়ার দিন তারিখ ও নৌকার ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেন। ইতিমধ্যে নুরুল আমীন তালুকদারের লোকজন বড় একটি পাতাম নৌকাও ঠিক করে  ফেলে। দুদিন পর নুরুল আমীন তালুকদারের নেতৃত্বে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কিছু পুলিশ সদস্যসহ এলাকার ছাত্র-যুবকদের মধ্যে যারা যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক তাদেরকে নিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে সীমান্ত এলাকা মহেষখলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার পথে সকাল বেলা নাজিরগঞ্জ বাজারের ঘাটে আমার সঙ্গে দেখা হয় এবং চা পান করে নৌকা নিয়ে সীমান্তএলাকায় চলে যান।“ নুরুল আমিন তালুকদার মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধান আব্দুল খালেকের স্টাফ অফিসার হিসেবে কাজ করতেন।

মৃত্যু: তিনি ৪ জুন ২০০৩ সালে নয়াদিল্লীর স্কট হার্ট ইন্সটিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

পুরষ্কার ও সম্মানণা: ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute Silver Award-2025” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।

0

Subtotal