আহমেদ সামির
জনাব খালেকদাদ চৌধুরী মতিয়ুর রহমান চৌধুরীর কাছে জানতে চান এখন তারা কি চায় । তারা বলে যে, খালেকদাদ চৌধুরীকে দেখার পর থেকেই এবং তাদের ন্যায় বিচারের ধারা দেখে আশা হয়েছে যে, তারাও তাদের ব্যাপারে সুবিচার পাবে। বর্তমানে তারা মেহের আলী[২] [৩][৪]হত্যার বিচার ও তাদের জিনিসপত্র ফেরত নিতে চান। তা পেলেই তারা কৃতার্থ হবেন। জনাব খালেকদাদ চৌধুরী মতিয়ুর রহমান চৌধুরীকে, পরের দিন তাদের কেসের তারিখ জানিয়ে দেবেন বলে বিদায় করেন। সেদিন সেখান থেকে পরদিন ৯টা দশটার দিকে বিচারের তারিখ জেনে যেতে বলেন। মতিয়ুর রহমান চৌধুরী বলে যে, না তাদের থাকা সম্ভব নয়। কাল সকালে তারা আবার আসবে। তাদের বাড়ী দুগনই গ্রামে। এখান থেকে নৌকা পথে দু’ঘন্টার রাস্তা। সন্ধ্যার আগেই তারা বাড়ী ফিরে যাবে। চার দাঁড়ের নৌকা দ্রুত বেয়ে তারা এখানে আসা যাওয়া করে। ওরা চলে যাওয়ার পরই জনাব খালেকদাদ চৌধুরী ডাঃ সাহেবকে ডাকেন। তিনি ঘুমিয়েছিলেন। তাকে ওদের কথা সব বলেন । এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করেন যে. কালই ওদের কেসের তারিখ দেবেন। হেকিম সাহেবকেও রাজী করাবেন। এরপর তারা তাদের দৈনন্দিন কাজে সন্ধ্যার পরই অফিসে হাজির হন। অফিসের কাজ সেরে রাত দশটা পর্যন্ত হেকিম চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে ওদের কেসের তারিখ নির্ধারণের ব্যাপারে আলোচনা করেন। প্রথমদিকে তিনি নানা অসুবিধার কথা বলে তারিখ আরো পরে নির্ধারণের কথা জোর দিয়ে বলতে থাকেন। তাতে তারাও(খালেকদাদ চৌধুরী , ডাঃ সাহেব) তাদের মতে দৃঢ় থাকেন এবং শেষটায় তাকে বুঝাতে সমর্থ হন যে, ব্যাপারটা যতই দেরী হবে ততই তাদের ন্যায় নীতি এবং সততার প্রতি তাদের কর্মী ও সদস্যসহ বহু লোকের মন সন্ধিগ্ধ হবে। সাতদিনের মধ্যে কেসের তারিখ নির্ধারণ করেন। পরদিন সকাল আটটায় অফিসে খালেকদাদ চৌধুরী যান। দশটায় ট্রাইব্যুনালে বসেন। ইতিমধ্যে ওরাও(মতিয়ুর রহমান চৌধুরীসহ অন্যরা) এসে গেছে। তিনি তাদের ডেকে বিচারের তারিখ জানিয়ে দেন এবং সেই দিন ঠিক দশটায় হাজির হতে নির্দেশ দেন এবং তাদের জিনিসপত্রের লিস্ট দিতে বলেন। তারা জানায়, একপ্রস্থ লিস্ট ক্যাম্প অফিসেও আছে। সেটা দেখেই সে অনুযায়ী রায় দিন। আমরা আপনাদের সে রায়ই মেনে নেব। ওরা বিদায় হলে হেকিম চৌধুরী সাহেবকে সে তালিকায় উল্লেখিত সমস্ত জিনিস ঐদিন অফিসে এনে জমা রাখতে বলেন। হেকিম চৌধুরী জানান যে, জিনিসগুলো সেকান্দর নুরীর বাসগৃহে রয়েছে। লিস্টও তার কাছে । তবে এক কপি তার নিজের কাছেও আছে। নির্ধারিত তারিখের দু’দিন আগেই লিষ্ট অনুযায়ী সমস্ত জিনিসপত্র আমাদের কার্যালয়ের সামনের খোলা জায়গায় জমা করা হয়। এ ব্যাপারে পুরো দু’দিন লেগে যায়। জিনিসপত্রের সংখ্যা দেখে সবাই তাজ্জব বনে যায়। এত জিনিসপত্র যে গ্রামাঞ্চলের কোন অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ীতে থাকতে পারে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বড় থেকে সাইজ করে সাজানো ২৮টি তামার ও এলুমিনিয়াসের ডেকচি, ৯টি বড় বড় ষ্টীল ট্রাঙ্ক ভর্তি কাপড় চোপড় ( বেশীরভাগ শাড়ী, ব্লাউজ, ওড়না)। যার অধিকাংশই সিল্ক, নাইলন ও টিসুর সূতী বস্ত্রাদিও প্রচুর। তাছাড়া কাসা, চীনা মাটির থালা-বাটি ও অন্যান্যবাসনের সেট, বেশ কয়েকটি দামী ঘড়ি ও ঝর্না কলম, আরো অনেক কিছু । যা শহরের বিত্তবান পরিবারেও বিরল। নির্ধারিত দিনে ওরা(মতিয়ুর রহমান চৌধুরীসহ অন্যরা) এলো। দুপুর দুটা থেকে তাদের মালামাল তালিকা মিলিয়ে তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে শুরু করেন। ৪টার দিকে খালেকদাদ চৌধুরী স্নান খাওয়া সারতে চলে যান। পরে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত একটা পর্যন্ত সব কিছু ফেরৎ দেওয়ার কাজ শেষ হলে তারা রশিদ দিয়ে তা নিয়ে যায়। কাজ শেষে তারা তাদের সব জিনিস পেয়েছে কি না জানতে চাইলে কিছুক্ষণ নীরব থেকে মাতব্বর লোকটি তথা মতিয়ুর রহমান চৌধুরী বলে যে, যা পেয়েছে তাতেই তারা খুশী। আরো বলে যে, আপনারা আসাতে এবং একাজে তদারক করাতেই তারা তা পেয়েছে নচেৎ তারা এসবের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলো। তবে একটা জিনিস শুধু পেল না। সেটা পেলেই তারা সবচেয়ে বেশী খুশী হতো। সেটা কি জানতে চাইলে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে যে, মেয়েদের একটি হাত ঘড়ি। ঘড়িটি মেহের আলীর স্ত্রীর। মেহের আলী তার স্ত্রীকে বিয়েতে উপহার দিয়েছিল। আমি বলি যে, যা লিষ্টে পেয়েছি তার সবই দিয়েছি। কিন্তু এ রকম ঘড়িতো লিষ্টে নেই। যাক, তবে ঘড়িটি যে আছে তারা তা জানে । বোঝা গেল বলতে সাহস পাচ্ছে না। পরিষেশে মতিয়ুর রহমান চৌধুরী, মেহের আলীর হত্যার বিচার ও তার পরিবারের জন্য কিছু করার অনুরোধ করেন। এরপর তারা আর কিছু না বলে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জিনিসপত্র তাদের নৌকায় তুলতে শুরু করে। ট্রাইবুনালের সদস্যরাও উঠে পড়েন। “
প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন [৫]ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার “মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”- [৬] প্রবন্ধতে মধ্যনগর উপজেলায় বীরমুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম সস্পর্কে লিখেছেন – “পরবর্তীতে মহেষখলা ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয় ।
দুগনৈ গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ গঠন: জনাব মোঃ মেহের আলী মোঃ আকিকুর রেজাকে সভাপতি ও জনাব আব্দুল আওয়ালকে সাধারণ সম্পাদক করে মধ্যনগর থানায় প্রথম দুর্গনৈ গ্রামের সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। ঐ কমিটির অন্যান্য সদস্য যারা ছিলেন তারা হলেন-সর্বজনাব – ১.জনাব মোঃ আজাদুর রেজা(তার এক ছেলে দেশের একটি প্রসি্দ্ধ গ্রুপ অব কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এক জামাতা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের উকিল), ২. জনাব মোঃ এখলাছ উদ্দিন চৌধুরী,৩. জনাব মোঃ আজনুর, ৪, জনাব মোঃ মান্নান আলী,৫. জনাব মোঃ তকসির,৬. জনাব মন্তাজিদ চৌধুরী, ৭. জনাব মোঃ কাঁচামনি, ৮. জনাব মোঃ আদম, ৯. জনাব মোঃ দুলই,১০. জনাব মোঃ পান্ডব আলী, ১১. জনাব মোঃ মহশিব আলী,১২. জনাব হাফেজ মোঃ মতিউর রহমান চৌধুরী,১৩. জনাব মোঃ মতিউর রহমান,১৪. জনাব মোঃ আব্দুল হাজির। সুনামগন্জ জেলার প্রখ্যাত আইনজীবি জনাব আব্দুল মতিন চৌধুরী (তার দুই ছেলে সুনামগন্জ ও সিলেটের প্রখ্যাত আইনজীবি) সব সময় তাদেরকে মূল্যবান উপদেশ দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন।
ক্যাপ্টেন গণীর দুগনৈ গ্রামে আগমন: সম্ভবতঃ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ক্যাপ্টেন গণী ১৫০ জন ইসি সদস্য নিয়ে দুগনৈ গ্রামে আসেন। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্বে এবং নিদের্শনায় তাদের সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় দুদিন দু-রাতের জন্যে। পরবর্তীতে মেহের আলীর নির্দেশে তাদের জন্যে নুর মিয়া চৌধুরীর বাড়ীতে মাছিমপুর ও কান্দা পাড়ায় ৩য় দিন তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ৪র্থ দিন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের দিয়ে নিরাপদে তাদের ভারতের তুরায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ক্যাপ্টেন গণীর কাছে জনাব রেজা জানতে পারেন যে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী [৭]( পরবর্তীতে আশ্রমবাড়ি সাব সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পান) আশ্রমবাড়ি সাব সেক্টরের দায়িত্বে আছেন।খুব শীঘ্রই তিনি তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে জনাব ইজাজ জনাব রেজার মাধ্যমে ক্যাপ্টেন মান্নান ও মহেষখলা ক্যাম্পের উর্ধতন পরিচালকবৃন্দ তথা জনাব মেহের আলী, খালেকদাদ চৌধুরীর সাথে অত্যন্ত গোপনে তথ্য আদান প্রদান করতেন। তথ্য আদান প্রদানকারী হিসেবে কাজ করেছেন জনাব সৈয়দ আলী তাং ও হাজী গাজী নবী নওয়াজ।উল্লেখ্য যে মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী জনাব রেজা ও মধ্যনগরের সাবেক কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা জনাব নুরুল ইসলামের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে গেছেন।
মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন: পরবর্তীতে জনাব মেহের আলী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভূইয়াকে সভাপতি (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।) ও জনাব আব্দুল আওয়ালকে সহ-সভাপতি (পরবর্তীতে তিনি ধরমপাশা উপজেলার দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন-উল্লেখ্য-তার এক মেয়ে ডাক্তার ও জামাতা সেনবাহিনীর কর্নেল) এবং শ্রী দূর্গেশ কিরণ তালুকদার বাদলকে (মধ্যনগর বাজার – তার এক ছেলে মধ্যনগর থানার প্রভবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা) সেক্রেটারী করে মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। এই কমিটিতে অন্যান্য যারা ছিলেন সর্বজনাব- সহ সভাপতি : শ্রী হেম চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার- তার এক ছেলে মধ্যনগর থানার প্রভবশালী রাজনৈতিক নেতা ), সহ সভাপতি : শ্রী ললীত মোহন রায় (মধ্যনগর),সহ সভাপতি : আক্কেল আলী তালুকদার (বংশীকুন্ডা),সহ সাধারণ সম্পাদক : শ্রী পরিতুষ রায় (মধ্যনগর বাজার),সহ সাধারণ সম্পাদক : শ্রী প্রতাপ চন্দ্র দাস (খালপাড়া শিয়ালকান্দা),সাংগঠনিক সম্পাদক : আব্দুল আজিজ (মধ্যনগর বাজার),সহ সাংগঠনিক সম্পাদক : আব্দুল আজিজ (পিপড়াকান্দা),সহ সাংগঠনিক সম্পাদক : এখলাছ চৌধুরী (দুগনই),অর্থ সম্পাদক : মতিউর রহমান চৌধুরী হাফেজ (দুগনই- তার এক ছেলে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানীর Chief Financial Officer-CFO,আরেক ছেলে প্রতিষ্ঠিত ব্য়বসায়ী ),সহ অর্থ সম্পাদক : শ্রী গয়নাথ চন্দ্র দাস (গোল্লা),দপ্তর সম্পাদক : হাতেম আলী মেম্বার (উত্তর বংশীকুন্ডা),সহ দপ্তর সম্পাদক : হাছান আলী মাষ্টার (উত্তর বংশীকুন্ডা),সদস্য সচিব : আব্দুল হক শাহ্ (বনগাঁও),তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী রঘুনাথ কানু (মধ্যনগর বাজার),সহ তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : সত্য নারায়ণ কানু (মধ্যনগর বাজার),সহ তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী অমর টেইলার (মধ্যনগর বাজার),আপ্যায়ন সম্পাদক : শ্রী অধিগুপ্ত (জমশেদপুর),রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য (মধ্যনগর বাজার),সহ রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী যুগেশ সরকার (মাছিমপুর),সহ রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী ফুলের দত্ত (গোলাইখালী),স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : আব্দুল করীম তালুকদার (আবিদনগর শিয়ালকান্দা),সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : শ্রী সত্যপদ রায় (মধ্যনগর বাজার),সহ ̄স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : আব্দুর রেজ্জাক টেইলার (মধ্যনগর বাজার) ,যোগাযোগ ও পরিবহণ সম্পাদক : শ্রী গোপাল বণিক (মধ্যনগর বাজার),সহ যোগাযোগ ও পরিবহণ সম্পাদক : শ্রী শীতেশ চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার),প্রচার সম্পাদক : শ্রী প্রদীপ তালুকদার (মাছিমপুর),সম্মানিত সদস্য: শ্রী নৃপেন্দ চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য : শ্রী চম্পা বনিক (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: শ্রী যাদু মালাকার (ইটাউরী),সম্মানিত সদস্য: শ্রী সমর বিজয় রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: শ্রী ̄স্বদেশ রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: আব্দুল ছাদেক (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব (মধ্যনগর),সম্মানিত সদস্য : বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ তালুকদার (সাজদাপুর)। মধ্যনগর এলাকাটি ছিল বেশ দূর্গম।বর্ষাকাল নৌকা ও শুকনো মওসমে পায়ে হাটা ছাড়া আর কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। তাই এখানে পাকসেনারা আক্রমণ করার সাহস পায়নি।তবে পাকসেনাদের দোসরেরা বেশ সক্রিয় ছিল।তারা লুটতারাজ ,খুন রাহাজানী করে বেড়াত। মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর নেতৃবৃন্দ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করে। মজুদদারের জাতে নিত্যপণ্য সামগ্রী মজুত করে চরা দামে বিক্রি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রেখে রেশনীং ব্যবস্থা চালু করা হয়। মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ পাড়া মহল্লায় পাহরার ব্যবস্থা করে যাতে দষ্কৃতীকারীরা মানুষের ক্ষতি করতে না পারে।পাশাপাশি তারা অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতে থাকে ।
ক্যাপ্টেন মান্নানের অধীনস্থ নেতৃত্ববৃন্দের তালিকা: মহেষখলার ১১নং সেক্টরের সামরিক কমান্ডের দায়িত্তে ছিলেন মেজর আবু তাহের এবং যুদ্ধের শেষের দিকে দায়িত্ত নেন মেজর জিয়া। এই সেক্টরের দক্ষিণাংশে ক্যাপ্টেন মান্নান তার অধীনস্থ ১৫০ জন ই পি আর এবং সংগৃহীত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেন।এই দলটির অন্যান্য যারা নেতৃত্তে ছিলেন তারা হলেন সর্বজনাব– ১.সুবেদার নায়ক মোজাফর আহমেদ ২. সুবেদার মোঃ মুরশেদ ৩.সামরিক টেনিং মাস্টার মাহাতাব উদ্দীন ৪. সামরিক ডাক্তার আনছার আলী। এই ক্যাম্পের অধীনে সুনামগঞ্জের পশ্চিমাংশ, নেত্রকোনার উত্তরাংশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কার্য্যক্রম বহাল রাখেন ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ইং পর্যন্ত।
মহেষখলা ক্যাম্পে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ: মহেষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা। ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। তাই মহেষখলা ক্যাম্পের জন্য অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবেই সংগৃহীত হতো। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্ত্বে জনাব মোঃ আকিকুর রেজা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতে থাকেন। নেতৃবৃন্দ ঐ সময় জনাব রহমত আলী তালুকদার, জনাব আক্কেল আলী তালুকদার ও আব্দুর রউফ চৌধুরীর কাছ থেকে ১৩০০ মন ধান, ১০০০ মন লাখড়ী, ৩০০শত সিরামিকের খাবার প্লেট, ৫০টি বড় চামুচ,গরু, ছাগল, মাছ ,মুরগী মহেষখালা ক্যাম্পে পাঠান যা ক্যাম্প পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
মেজর এম এ মোত্তালিবের দুগনৈ গ্রামে আগমন: এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর মোত্তালিবের (পরবর্তীতে যিনি সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন) নেতৃত্বে কয়েকশ’ সামরিক কর্মকর্তা ও ইপিআর সদস্য দুগনৈ গ্রামে আসে।মেজর মোত্তালিব[৮] নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার কাজলা গ্রামের বাসিন্দা এবং মেহের আলীর ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন। এলাকার মানুষ মেজর সাহেবের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেখে মুক্তিযু্দ্ধে যাওয়ার জন্যে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। মেজর মোত্তালিব এলাকার মানুষকে যার যা আছে তা নিয়ে মুক্তিযু্দ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্যে আহবান জানান। জনাব মেহের আলী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের জনাব আকিকুর রেজা ও আব্দুল আওয়ালসহ অন্যাণ্য নেতৃবৃন্দের নিয়ে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং পরের দিন তাদেরকে নৌকায় করে নিরাপদে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এর কিছুদিন পর জনাব মেহের আলী মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের সমস্ত দায়িত্ব জনাব আকিকুর রেজার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে মহেষখলা ক্যাম্পে চলে আসেন তাঁর উপর অন্যান্য দায়িত্ব পালনের জন্য। মেহের আলীর নির্দেশক্রমে জনাব আকিকুর রেজা তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব স্বচ্ছতার সাথে পালন করতে থাকেন। পূর্বের মতোই তিনি অন্যান্য জেলা হতে আগত ভারত গামী মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ও ক্যাম্পে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ করতে থাকেন। খাদ্য সামগ্রী ছিল ইয়ুথ ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ও রিফিউজি ক্যাম্প পরিচালনার অন্যতম রসদ যাহা ছাড়া যুদ্ধই পরিচালনা করা সম্ভব হতো না।
মধ্যনগর উপজেলার বীরমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা: মধ্যনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব কমান্ডার মোঃ নুরুল ইসলাম, মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভূইয়া (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।), ইউনুছ মিয়া,মোঃ আতাউর রহমান, মোঃ আব্দুল জব্বার, মোঃ আব্দুল বারী খন্দকার, মোঃ মোতালেব, মোঃ নূরুল হক, মোঃ আব্দুর রহিম, বীরবল চন্দ্র দাস, মোঃ সুরুজ আলী, শুধাংশু রঞ্জন বিশ্বাস, মোঃ আব্দুল বারী খন্দকার , নুরুল ইসলাম , মরুহম আব্দুর রউফ, কমান্ডার মোঃ নুরুল ইসলাম, আব্দুল বারী আহম্মদ মোঃ গাজী আব্দুল হক, মোঃ পান্নু মিয়া, মোঃ,মোঃআঃ বারিক, মোহাম্মদ আলী, আলী আমজাদ,বেণু ভূষণ দাস, রমা রাণী দাস প্রমুখ।
মধ্যনগরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী শহীদ হওয়ার পর দুগনৈ গ্রামে তার শ্বশুর বাড়ীটি দুই দুই বার লুট করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার অপরাধে ও পূর্বশত্রুতার জেরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাতজন বীর সহযোদ্ধাকে দুষকৃতিকারীরা (যাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় লুন্ঠন ও নিরাপরাধ মানুষদেরকে হত্যার বহু অভিযোগ ছিল) হত্যা করে। শহীদ মেহের আলীসহ যে সকল সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তারা হলেন – শহীদ তাজনুর,শহীদ কাচা আবু,শহীদ সল্লুক চৌধুরী, শহীদ লাল চান, শহীদ আব্দুল লতিফ, শহীদ আব্দুল হাসিম, শহীদ আব্দুল বাহার। “
বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী” প্রবন্ধতে লিখেছেন -“জুলাই থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী ব্যাপকভাবে আসতে শুরু করে। পূর্বেও এসেছে। তবে এত ব্যাপকভাবে নয়। ওরা সাধারণত দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, নাজিরপুর এবং বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর ঘাঁটি তাদের চলাচলের উপর আক্রমণে ছিলো সীমাবদ্ধ। এ সময় নৌকা চলার পথ সুগম হওয়ায় এবং পানিতে ভরে যাওয়ায় মুক্তিবাহিনীর কোম্পানীগুলোকে সুনামগঞ্জ মহকুমা এবং ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন স্থানে ও ময়মনসিংহ সদরের কোন কোন স্থানে আক্রমণ পরিচালনার জন্য প্রেরিত হতে থাকে।কোম্পানীগুলি মহিষখলা এসে পৌঁছার পরই ক্যাম্প কমিটি সেখানে নৌকা যোগাড় করে তাদের দেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে এই বিরাট হাওর এলাকার সবটাই মুক্ত এলাকা ছিল এবং তখন থেকে মুক্তিবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। এসব কোম্পানীগুলি নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের তৎপরতা চালায়। কলমাকান্দা, বারহাট্টা, ধরমপাশা, মোহনগঞ্জ, আটপাড়া, মদন, খালিয়াজুরী, ইটনা, তাড়াইল, নিখলী, করিমগঞ্জ, অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, নান্দাইল, কেন্দুয়া, দিরাই প্রভৃতি থানার পাক সেনাদের ঘাটিগুলি ছিল এদের লক্ষ্যস্থল। সুযোগ মতো এসব ঘাটিতে আকস্মিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে শত্রুদের থানা প্রাঙ্গণেই আটকে রাখে। থানার বাইরে বেরুবার দু:সাহস ওদের হতো না। কোনদিন বের হলেই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হতে হতো। কোন কোন স্থানে খন্ড যুদ্ধও হয়েছে। সবখানেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে মার খেয়েছে ভীষণভাবে। “
মধ্যনগরে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক: মহেষখলায় সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২-১৩ সালে নির্মিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মৃতিসৌধ। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র(Bangladesh Muktijudho Research Institute,Australia – এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান)–এর মাধ্যমে অত্র এলাকার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ক্যাম্প, মধ্যনগর, দুগনৈসহ অন্যান্য গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের কথা সবিস্তারে জানতে পারে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র-এর উৎসাহ ও উদ্দীপনায় এলাকাবাসী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ স্মৃতি পরিষদ-সুনামগঞ্জ,মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাব-দুগনৈ,মধ্যনগর নামে তিনটি সংগঠন গড়ে তুলে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র “মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার” ও “শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাব” নামক প্রতিষ্ঠান দুটিকে বই পুস্তক ও খেলাধুলার সামগ্রী দিয়ে সার্বিকভাবে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, শহীদ স্মৃতি পরিষদ-সুনামগঞ্জ,মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাবের মাধ্যমে ক্রীড়া ও অত্র এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী সংগ্রহ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা , মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মান্না এবং আর্থিক অনুদানের প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র মধ্যনগর ও মহেষখলা ক্যাম্পের ঘটনাবলী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী নিয়ে “মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না” নামে একটি বই প্রকাশ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব-১[৯][১০]