অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার
শিক্ষা জীবন ও ভাষা আন্দোলনে অবদান : বাড়ির কাছের অ্যাংলো-অ্যারাবিক মাদরাসা থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চতর নিউ স্কিম মাদরাসায় ভর্তি হন। বাবা ইসলামিক ওয়াজ মাহফিল করবার জন্য বছরের বেশিরভাগ সময়ই নেত্রকোনায় থাকতেন। তাই তার বাবা তাকে নেত্রকোনায় নিয়ে আসেন ১৯৪২ সালের দিকে এবং নেত্রকোনা শহরের আঞ্জুমান হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। জনাব নুরী [2]আঞ্জুমান হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। জনাব নুরী নেত্রকোনাতে ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও শহীদ বুদ্ধিজীবি বীর মুক্তিমুযোদ্ধা মেহের আলীর[3] [4][5][6][7][8][9]বাবা জনাব আক্তার আলীর বাড়ী ইসলামপুর গ্রামে থেকে পড়াশোনা করেন। এ বাড়ী থেকেই নেত্রকোনায় তেভাগা আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ত দিয়েছেন তমদ্দুন মজলিসের নেত্রকোনা শাখার সভাপতি জনাব নুরী। জনাব নূরী মেহের আলীকে যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে গড়ে তুলেন। তিনি স্কুল ছাত্র মেহের আলীকে নিয়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন মিছিল মিটিং এ অংশগ্রহন করতেন্। ভাষা আন্দোলন [10][11]ও তমদ্দুন মজলিসের কাজে জড়িয়ে পড়ায় লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। পরবর্তীতে জনাব নূরী ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে বিএ পাস করেন।উল্লেখ্য যে, নেত্রকোণা জেলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী সাবেক এম.পি আব্দুল খালেক সাহেব দীর্ঘ ১০/১২ বছর এই বাড়ীতে ছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতি হতে দলীয় রাজনীতির নেতৃত্বে উঠে আসেন। প্রখ্যাত ভাষা সৈনিক আজিম উদ্দীন ও শহীদ মেহের আলীদের বাড়ীতে ছিলেন প্রায় ২১/২২ বছর (১৯৪৭-১৯৬৯ পর্যন্ত)। ঐ বাড়ীটি তখন নেত্রকোণা জেলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছিল।
কর্মজীবন: সানাউল্লাহ নূরী ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘লুসি গ্রে’ এবং কিটসের ‘ফায়ারিং সং’ কবিতা অনুবাদ করেন। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় আন্ধার মানিকের রাজকন্যা উপন্যাস লিখেছেন।তিনি বিভিন্ন সময় তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক, মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক মিল্লাত, মাহে নও, মাসিক সওগাত ও দৈনিক নাজাতে কাজ করেছেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সিলভার বার্ড নামে মার্কিন প্রকাশনা সংস্থর ঢাকা শাখার পাঠ্যপুস্তক বিভাগের খণ্ডকালীন সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনের ঢাকা শাখার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তানের জন্মলগ্নে তিনি এর সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৭৯ পর্যন্ত এ পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ দৈনিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক, ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ দৈনিক জনতার সম্পাদক এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ছিলেন। সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন নিরলস, দক্ষ ও নির্ভীক কলমসৈনিক। চল্লিশের দশক থেকে শুর“ করে আমৃত্যু সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে কাজ করেছেন। তার লিখিত গ্রন্থগুলো দেশের সুধী মহলে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন একাধারে সম্পাদক, ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, সংগঠক, কলামিস্ট। ১৯৮৮ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ কাউন্সিল অব এডিটরস’ গঠন করেন। জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসরের সভাপতি ছিলেন ১৯৭৭ থেকে আমৃত্যু। তিনি বিভিন্ন সময় ৬০টির মতো দেশ ভ্রমণ করেছিলেন।
মৃত্যু : জনাব সানাউল্লাহ নূরী ২০০১ সালের ১৫ জুন ইন্তেকাল করেন।
পুরষ্কার ও সম্মানণা : ১৯৮২ সালে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাকে “একুশে পদক দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijuddho Research Institute Silver Award-2025” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।