সেই ভোরের কান্না

আহমেদ সামির

মরিয়ম বেগমের ঘুম ভাঙল আজানের শব্দে নয়—বাইরের অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ। গ্রামের আকাশে তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটেনি, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের অস্বস্তি, যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ছেলে, আঠারো বছরের কিশোর রাশেদ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্থির হয়ে উঠেছিল। গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে গোপনে মিটিং করত, রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন যেত। মরিয়ম বুঝতেন—দেশে ঝড় উঠেছে, আর সেই ঝড় তাঁর ছেলেকেও টেনে নিচ্ছে। কিন্তু তিনি কখনো বাধা দেননি। শুধু বলতেন, “বাবা, সাবধানে যাস। তোরে ছাড়া আমার আর কেউ নাই।”সেদিন ভোরে রাশেদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আজ একটু দূরে যেতে হবে। হয়তো ফিরতে দেরি হবে।” মরিয়ম তার মুখে হাত রেখে বললেন, “খোদা তোরে হেফাজত করুক, বাবা।”রাশেদ হেসে বলল, “মা, দেশ স্বাধীন হলে তোমারে নতুন শাড়ি কিনে দেবো।” এই ছিল তাঁর সঙ্গে রাশেদের শেষ কথা।

যুদ্ধের আগুনে হারিয়ে যাওয়া

সেদিন দুপুরের দিকে হঠাৎ গুলির শব্দে কেঁপে উঠল পুরো গ্রাম। পাকিস্তানি সেনারা হানা দিয়েছে—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ ছুটোছুটি শুরু করল। মরিয়ম দৌড়ে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু চারদিকে শুধু ধোঁয়া, আগুন আর মানুষের আর্তচিৎকার।গ্রামের এক বৃদ্ধ চিৎকার করে বললেন, “মরিয়ম! রাশেদদের দলটার দিকে সেনারা গেছে! ওরা নদীর ধারে ছিল!” মরিয়মের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। তিনি খালি পায়ে দৌড়াতে লাগলেন নদীর দিকে। পথজুড়ে পোড়া ঘর, ছড়িয়ে থাকা কাপড়, ভাঙা হাঁড়ি—যেন পুরো গ্রামটা এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নদীর ধারে পৌঁছে তিনি দেখলেন—মাটিতে রক্তের দাগ, ছড়িয়ে থাকা স্যান্ডেল, আর ছেলেদের ব্যবহৃত কিছু কাপড়। কিন্তু রাশেদ নেই। কেউ নেই। শুধু নদীর বাতাস আর ভাঙা নৌকার পাশে পড়ে থাকা একটি ছেঁড়া গামছা—যেটা রাশেদ প্রায়ই ব্যবহার করত। তিনি গামছাটা বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। “বাবা… তুই কোথায় গেলি? একবার ডাক দে, বাবা…” কেউ উত্তর দিল না। সন্ধ্যার পর খবর এল—সেনারা কয়েকজন তরুণকে ধরে নিয়ে গেছে। কেউ বলল, তাদের ট্রাকে তুলে নিয়ে গেছে শহরের দিকে। কেউ বলল, নদীর ওপারে গুলি করে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারল না রাশেদ বেঁচে আছে কি না।

একজন মায়ের অপেক্ষা”

দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়—মরিয়ম প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে বসে থাকেন। তাঁর চোখ রাস্তার দিকে, যেন রাশেদ হঠাৎ ফিরে আসবে। গ্রামের মানুষ তাঁকে সান্ত্বনা দেয়, কেউ বলে রাশেদ শহীদ হয়েছে, কেউ বলে হয়তো বেঁচে আছে। কিন্তু মরিয়মের হৃদয় কোনো সিদ্ধান্ত মানতে চায় না। একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গ্রামে আসে। তাদের একজন মরিয়মকে চুপচাপ একটি ছোট কাপড়ের থলে দেয়। ভেতরে রাশেদের নাম লেখা একটি কাপড়ের টুকরো, আর একটি মরিচা ধরা বুলেট। যোদ্ধা বলল, “খালা, রাশেদ খুব সাহসী ছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে। আমরা তাকে পাইনি… কিন্তু তার লড়াই আমরা দেখেছি।” মরিয়ম থলেটা বুকে চেপে ধরে শুধু বললেন, “আমার ছেলে বীর ছিল… এটাই আমার সান্ত্বনা।”দেশ স্বাধীন হলো ১৬ ডিসেম্বর। গ্রামে উৎসব, আনন্দ, বিজয়ের গান। কিন্তু মরিয়মের ঘর নিস্তব্ধ। তিনি দরজার সামনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা, দেশ স্বাধীন হইছে। তুই তো বলছিলি, স্বাধীন হলে আমারে নতুন শাড়ি দিবি… আমি এখনো অপেক্ষা করি, রাশেদ।”বাতাসে শাড়ির আঁচল দুলে উঠল। যেন রাশেদ কোথাও থেকে ফিসফিস করে বলছে— “মা, আমি আছি… দেশের মাটির ভেতরেই আছি।”মরিয়ম চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুখে অশ্রু, কিন্তু সেই অশ্রুর ভেতর গর্বও আছে—একজন শহীদ মায়ের গর্ব।

 

 

 

 

 

 

0

Subtotal