শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার

নেত্রকোনা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা :-[]

সদর থানায় এ পর্যন্ত মোট ১২ জন বীর শহীদের তালিকা পাওয়া গেছে। তাদের ১ জন রণাঙ্গণের বাইরে এবং ১১ জন সরাসরি রণাঙ্গণে শহীদ[] হয়েছেন।

রণাঙ্গণের বাইরে নেত্রকোণার যে সকল মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ বাংগালীর হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা বাস্তবায়নে জীবন উংসর্গ করেছেন তাদের তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলঃ

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলীঃ শহীদ মেহের আলী []ছিলেন নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে একমাত্র শহীদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম (সরকার নির্ধারিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী) যিনি বীর মুক্তিমুযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৭ই মে মহেষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন কালে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন । তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মহেষখলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা,নেত্রকোনায় সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সংগঠন “ছাত্রসংস্থা”-র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান উদ্যেক্তা(যখন দেশে সামরিক আইনের কারনে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল তখন এই গোপন সংগঠনটি গড়ে তোলা হয় যার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হতো),নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি(বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন),জেলা শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,নেত্রকোনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের []অন্যতম স্থপতি,মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার  []প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক, যুবজাগরণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি(মালনী রোড-বর্তমানে সমিতি ঘরটিকে মসজিদে রুপান্তরিত করা হয়েছে) এবং জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক’৭১পর্যন্ত।(ষাটের দশকে ছাত্রদের পর শ্রমিক ও কৃষক গোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন। এই দুটি গোষ্ঠী নেত্রকোনায় স্বাধীকার আন্দোলন,সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।) । ১৯৫২ সালে ভাষার দাবীতে আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন শহীদ মেহের আলী দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ও ২৩ শে ফেব্রুয়ারী নেত্রকোণায় দত্ত উচচ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মিছিলে অংশ গ্রহণ করেন ।“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই “ শ্লোগানে রাজপথ কাপিয়েছেন। মেহের আলী ৫৯,৬০,৬২,৬৪,৬৬,৬৯,৭০,৭১ তথা যাটের দশকের প্রতিটি রাজনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সফলভাবে নেতৃত্ত দিয়েছেন।[][][][][১০]

মুক্তিযুদ্ধে[১১] অংশগ্রহন করতে ভারতের মহেশখলা যাওয়ার পথে মধ্যনগর থানার[১২] দুগনৈ গ্রামে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মধ্যনগর সহ আশপাশ এলাকার ছাত্র যুবকদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করবার জন্য। বঙ্গবন্ধুর ৬দফার দাবীসহ ৬৯,৭০,৭১এর আন্দোলনগুলোকে নেত্রকোনার পাশাপাশি এই অঞ্চলেও জনপ্রিয় করে তোলেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এই অঞ্চলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা  আকিকুর রেজা ভূইয়া ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ধর্মপাশা উপজেলার  উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালকে সহ-সভাপতি এবং বাদল চন্দ্র দাসকে সাধারণ সম্পাদক  করে মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। মেহের আলী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে মধ্যনগর থানার ছাত্র ও যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন ও তাদের  থাকা খাওয়া এবং ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।  এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর মোত্তালিব (পরবর্তীতে যিনি সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন)  ও ক্যাপ্টেন গণীর নেতৃত্বে কয়েকশ সামরিক কর্মকর্তা ও ই পি আর সদস্য  দুগনৈ গ্রামে আসলে মেহের আলী উনার শ্বশুর বাড়ীতে কয়েকদিনের জন্য তাদের  সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং নিরাপদে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়াও মেহের আলী উনার শ্বশুর  রহমত আলী তালুকদারের বাড়ী থেকে শত শত মণ ধান, চাল, অন্যান্য সামগ্রী মহেষখলা ক্যাম্পে পাঠান যাহা ক্যাম্প পরিচালণায় অত্যন্ত গুরুত্তর্পূর্ণূ ভুমিকা পালন করে। তিনি নেত্রকোণা ও মধ্যনগরে শত শত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন।[১৩][১৪][১৫][১৬]

শহীদ মেহের আলী ১৯৩৭ সালে নেত্রকোণা মিউনিসিপ্যালিটির ইসলামপুরে জন্ম গ্রহন করেন । তিনি তাদের মালনী রোডের বাসায় থেকে  তার সফল ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক জীবন গড়ে তোলেন। ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য অবদান ও মুক্তিযুদ্ধে জীবন বিসর্জনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিক্রমে নেত্রকোণা পৌরসভা ১৯৯৮ সালে মুক্তিযুদ্ধে [১৭][১৮]শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে অজহর রোডের মোড় থেকে পূর্বদিকে ইসলামপুর পর্যন্ত এই রাস্তাটির নামকরণ করেছে – মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী সড়ক। মাননীয় সংসদ সদস্য  হাবিবা রহমান(শেফালী) ও নেত্রকোনাবাসীর অনুরোধে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালে  নেত্রকোনা চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি গেইটের নামকরন করেন “বীর মুক্তিযোদ্ধা  মেহের আলী  গেইট”, স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য অবদান ও মুক্তিযুদ্ধে জীবন বিসর্জনের জন্য “বিজয় একাত্তর সম্মাননা-২০২২”  এবং ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি সম্মাননা স্মারক ২০২২ প্রদান করা হয়। শহীদ মেহের আলী স্মৃতি রক্ষার্থে ২০২৩ সালে ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমির – উদ্যোগে  তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব শাহেদ পারভেজ “শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী বৃত্তি’ প্রবর্তন করেন।স্বাধীনতার পর পর শহীদ মেহের আলী স্মৃতি রক্ষার্থে “শহীদ মেহের আলী স্মৃতি পরিষদ” ও “শহীদ মেহের আলী স্মৃতি যুব জাগরণ সমিতি”, মালনী রোড(বর্তমানে সমিতি ঘরটিকে মসজিদে র“পান্তরিত করা হয়েছে) সংগঠন দুটি গঠন করা হয় । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে শহীদ মেহের আলীর পরিবারের জন্য এক হাজার টাকা সম্মানী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।

সরাসরি রণাঙ্গণে নেত্রকোণার যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ বাংগালীর হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা বাস্তবায়নে জীবন উংসর্গ করেছেন তাদের তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলঃ

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুর রাসিদ। তিনি খাটপুরা গ্রামের সদরজমা মন্ডলের পুত্র ছিলেন। ৯ ডিসেম্বর নেত্রকোণা মুক্তকরণ দিবসের যুদ্ধে পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। মারাদিঘী গ্রামে তাঁর কবর রয়েছে।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল জব্বার। ৯ ডিসেম্বর নেত্রকোণা মুক্তকরণ দিবসের যুদ্ধে তিনিও পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তিনি গাবরাগাতী গ্রামের হাসন আলী খানের পুত্র। তাঁর কবরস্থান নেত্রকোণা পৌর-গোরস্থানে রয়েছে।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবু সিদ্দিক আহম্মদ। তিনিও গাবরাগাতী গ্রামের সন্তান ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ডুমন শেখ। তাঁকেও নেত্রকোণা পৌর-গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল কাদির। ৯ ডিসেম্বর সকাল বেলা চ‚ড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি রেকী করতে শহরে এসেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত: তিনি প্রতিপক্ষের গুলিতে শহীদ হন। তিনি ছিলেন কুনিয়া গ্রামের নঈম উদ্দিন সাহেবের পুত্র। নিজ গ্রামেই তাঁকে কবর দেয়া হয়েছে।

৫। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিপাহী গোলাম মোস্তফা। তাঁর পিতার নাম জালাল আহম্মদ, বাসা শিবগঞ্জ রোড। তিনি ইপিআর বাহিনীর একজন জওয়ান ছিলেন। চট্টগ্রাম হালি শহরে ৩১ মার্চ প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর কবরস্থান এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

৬। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল খালেক। তিনি শহরের মালনী রোডের শেখ কলিম উদ্দিন সাহের পুত্র। তিনি আনসার বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। তিনি তাঁর ক্যাপ্টেন সাহেবের নির্দেশে রেকী করতে গিয়ে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি।

৭। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এলাহী নেওয়াজ উছমানী। তিনি কাটলী গ্রামের সমর আলী সাহের পুত্র ছিলেন। পাক আর্মির হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন। তাঁর লাশও পাওয়া যায়নি।

৮। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ লুৎফর রহমান। তিনি নন্দীপুর গ্রামের আব্দুল সোবাহানের পুত্র। হালুয়াঘাট থানার নাগলাবাজার যুদ্ধে পাক বাহিনীর গোলায় তিনজন সহযোদ্ধাসহ শহীদ হন। নাগলাবাজারে আঃ হামিদ কুলুর বাড়িতে একই কবরে চার শহীদকে দাফন করা হয়।

৯। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ফজর আলী। কান্দুলিয়া গ্রামের দাগু শেখের পুত্র ছিলেন তিনি। শহীদ লুৎফর রহমানের সাথে একই যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁদের ৪ জনের কবর একসাথে রয়েছে।

১০। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল আজিজ। তিনি দিঘলা গ্রামের মগবুল হোসেনের পুত্র ছিলেন। নাজমুল হক তারা কোম্পানীর এই বীর যোদ্ধা ২৬ জুলাই নাজিরপুর যুদ্ধে শহীদ হন। ১১৭২নং সীমান্ত পিলারের কাছে ৭ শহীদের সমাধীর একটি হচ্ছে তাঁর।

১১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ফজলুল হক। তিনি শহর নাগড়ার ফরহাদ আলীর পুত্র ছিলেন। নাজিরপুর যুদ্ধে শহীদ হয়ে ৭ শহীদের সমাধীতে তিনিও শায়িত আছেন।

মদন থানা

মদনে এ পর্যন্ত মোট ১০ জন বীর শহীদের নাম পাওয়া গেছে। নিম্নে তাঁদের পরিচয় দেওয়া হলো। তাঁরা হলেন-

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল কদ্দুছ। হাঁসকুড়ি গ্রামের একদিল হোসেনের পুত্র ছিলেন তিনি। মদনের প্রথম ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। গোবিন্দশ্রী গ্রামে তাঁর কবর রয়েছে।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল গফুর। তিনি গোবিন্দশ্রী গ্রামের মুতালিব মন্ডলের পুত্র। তাড়াইল যুদ্ধে আহত হয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণে তিনি শাহাদত বরণ করেন। গোবিন্দশ্রী নিজ গ্রামে তাঁর কবর রয়েছে।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক। আলমশ্রী গ্রামের নবী হোসেন তালুকদারের পুত্র ছিলেন তিনি। কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানার ধলা গ্রামের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। নিজ বাড়ীতেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিদ্দিকুর রহমান। তিনি আলমশ্রী গ্রামের সিরাজ আলী তালুকদারের পুত্র ছিলেন। তাড়াইল থানার ধলা যুদ্ধে আহত হয়ে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি।

৫। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মফিজ উদ্দিন। তিনি কাইটাইল গ্রামের আব্দুল মজিদের পুত্র ছিলেন। মোহনগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী ইলিয়াস আহমেদ উইংয়ের একজন যোদ্ধা হিসেবে তাহেরপুর থানা যুদ্ধে আহত হন এবং একদিন পর তাঁর মৃত্যু ঘটে। কাইটাইল নিজ জমিতে তাঁর কবর রয়েছে।

৬। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নিজাম উদ্দিন বীরবিক্রম। তিনি ছিলেন ছত্রকোণা ফতেহপুর গ্রামের সাইফুদ্দিন খানের পুত্র। ইপিআর বাহিনীর এই সদস্য রংপুরের যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।

৭। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোহাম্মদ আলী কাজল। মনোহরপুর গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের পুত্র ছিলেন তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফায়েত আহম্মেদ কোম্পানীর এই যোদ্ধা ধানুয়া-কামালপুর যুদ্ধে শহীদ হন। ধানুয়া সীমান্ত গ্রামে তাঁর কবর রয়েছে।

৮। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিপাহী আব্দুস সাত্তার। তালুককানাই গ্রামের আব্দুল বারী সাহেবের পুত্র ইপিআর বাহিনীর এই সদস্য ২৯ সেপ্টেম্বর যশোহর জেলার জয়দেবপুর যুদ্ধে শহীদ হন। সেখানকার কাশিমপুর গ্রামে তাঁকে কবর দেওযা হয়েছে।

৯। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিপাহী আব্দুল করিম। তিনি আলমশ্রী গ্রামের বাবর আলীর পুত্র ছিলেন। তিনিও ইপিআরের সদস্য হিসেবে ২৩ এপ্রিল যশোহরের নাভারণ যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরের সন্ধান মেলেনি।

১০। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাখাল চন্দ্র দেবনাথ। তিনি মাহড়া (মহেড়া) গ্রামের যতীন্দ্র নাথ হিরালীর (ফিরালী) পুত্র ছিলেন। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম প্রবেশকালে আখাউড়া যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। ভারতে কোথায় তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কেন্দুয়া থানা

এ পর্যন্ত কেন্দুয়ার ৫ জন বীর শহীদের তালিকা পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন:

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোখলেছুজ্জামান। বালিজোড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহেদের পুত্র ছিলেন তিনি। অসাধারণ সাহসী এই যোদ্ধা নেত্রকোণা-কেন্দুয়া সড়কে সংযোগ রাস্তায় বসুরবাজার ব্রীজ উড়িয়ে দিতে গেলে রাজাকারদের গুলিতে শহীদ হন। জুরাইলে তাঁর কবর রয়েছে।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোখলেছুর রহমান। কচন্দরা গ্রামের মনফর আলীর এই পুত্র ২৭ নভেম্বর আটপাড়া দুওজ গ্রামের এ্যাম্বুস যুদ্ধে শহীদ হন। কচন্দরা মৌজায় তাঁকে কবর দেয়া হয়েছে।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নায়েক সুবেদার আব্দুর রসিদ। রায়পুর গ্রামের শেখ আলমের পুত্র ছিলেন তিনি। ইপিআর-এর এই বীর জেসিও ৩১ মার্চ ঢাকার প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরস্থান পাওয়া যায়নি।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল মালেক। রাজনগর গ্রামের আমজাদ কোম্পানীর এই যোদ্ধা হালুয়াঘাটের নাগলা যুদ্ধে শহীদ হন। নাগলা বাজারের আব্দুল হামিদ কুলুর বাড়িতে ৪ জনের একই কবরে শায়িত আছেন তিনি।

৫। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জুমর আলী। তার গ্রাম হচ্ছে রোয়াইল বাড়ি। হালুয়াঘাটের সেই নাগলাবাজার যুদ্ধে তিনিও শহীদ হন। সেখানের এক কবরে ৪ শহীদের সাথে শায়িত আছেন তিনিও।

বারহাট্টা থানা 

এ পর্যন্ত দু’জন শহীদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন-

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিগন্যালম্যান মোকশেদ আলী। তিনি চন্দ্রপুর গ্রামের ওয়াহেদ আলীর পুত্র। ইপিআর বাহিনীর এই সদস্য দিনাজপুর যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবর এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাইদুর রহমান। তাতিয়র গ্রামের আব্দুল মন্তাজের পুত্র ছিলেন তিনি। বারহাট্টা থানা যুদ্ধে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তাতিয়র নিজ বাড়িতে তাঁর কবর রয়েছে।

আটপাড়া থানা

এখন পর্যন্ত আটপাড়া থানাতে দুই জন শহীদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোফাজ্জল হোসেন। তিনি দেবশ্রী গ্রামের আব্দুল জব্বারের পুত্র ছিলেন। ধর্মপাশা থানা মুক্ত করতে গিয়ে ১ ডিসেম্বর তারিখে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। দেবশ্রী গ্রামে তাঁর কবর রয়েছে।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হারেছ উদ্দিন ফকির : তিনি সালিকা-মাটিকাটা গ্রামের আমিন উদ্দিন ফকিরের পুত্র ছিলেন। বারহাট্টা থানা যুদ্ধে মারাত্মক আহত হয়ে কংস নদ সাঁতরিয়ে পার হবার সময় পানিতে তলিয়ে গিয়ে শহীদ হন। পাইকপাড়া মৌজায় তাঁর কবর রয়েছে।

দুর্গাপুর থানা

দুর্গাপুর থানায় এ পর্যন্ত ৪ জন বীর শহীদের খোঁজ পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সুধীর হাজং। বগাউড়া গ্রামের প্রকাশ হাজং এর এই বীর পুত্র আটপাড়া সীমান্ত ক্যাম্প দখলে নেওয়ার যুদ্ধে শহীদ হন। ১১৫২ নং সীমান্ত পিলার সংলগ্ন সুমেশ্বরী নদীর পশ্চিম তীরে সেই পরিচিত মন গাছটির নিচে তাঁকে দাহ করা হয়।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সন্তোষ চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি কুড়ালিয়া গ্রামের কটুচান বিশ্বাসের পুত্র ছিলেন। হানাদার বাহিনীর কমলবাড়ি ক্যাম্প আক্রমণ করে বীরের ন্যায় শহীদ হন। ১১৫২ নং সীমান্ত পিলার সংলগ্ন সুমেশ্বরী নদীর পশ্চিম তীরে সেই পরিচিত মন গাছটির নিচে তাঁকেও দাহ করা হয়।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল জব্বার। তিনি দুবরাজপুরের গুঞ্জর আলীর পুত্র ছিলেন। আটপাড়া সীমান্ত ক্যাম্পের যুদ্ধে এ্যাম্বুসে পড়ে শহীদ হন। তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুস সালাম। বল্লভপুর গ্রামের আব্দুল খালেকের পুত্র ছিলেন তিনি। তিনি সীমান্ত যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কলমাকান্দা থানা 

এখন পর্যন্ত কলমাকান্দা থানার ৪ জন বীর শহীদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পাইলট ইসলাম উদ্দিন। তিনি রঘুরামপুরের আব্দুল মজিদের পুত্র ছিলেন। বিমান বাহিনীর এই সদস্য ৭ অক্টোবর তারিখে ফ্লাইট লে: হামিদুল্লাহ খানের নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম জেলার আব্দুল্লাহপুর থানার বল্লাবাজার পাক ক্যাম্প আক্রমণ করে শহীদ হন। হানাদার ক্যাম্প দখল করে বল্লা বাজারেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হাফিজ উদ্দিন। পশ্চিম লেঙ্গুরা গ্রামের সদর আলী ফকিরের পুত্র ছিলেন তিনি। শিববাড়ি সীমান্ত যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। শিববাড়ি দহগ্রামে তাঁর কবর রয়েছে।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল মান্নান। জিগাতলা গ্রামের সদর আলী মন্ডলের পুত্র তিনি। তিনিও শিববাড়ি সীমান্ত যুদ্ধে হাফিজ উদ্দিনের সাথে শহীদ হন। দহগ্রামে তাঁরও কবর রয়েছে।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিপাহী আব্দুল কাশেম। উদাপাড়া গ্রামের আলীম উদ্দিন বেপারীর পুত্র ছিলেন তিনি। ইপিআর বাহিনীর এই সদস্য ১ জুন ঢাকার উপকন্ঠের যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মোহনগঞ্জ থানা

এখন পর্যন্ত মোহনগঞ্জ থানার ছয় জন শহীদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের ১ জন রণাঙ্গণের বাইরে এবং ৫ জন সরাসরি রণাঙ্গণে শহীদ হয়েছেন।

রণাঙ্গণের বাইরে মোহনগঞ্জ-এর যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ বাংগালীর হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা বাস্তবায়নে জীবন উংসর্গ করেছেন তাদের তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলঃ

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ দবির উদ্দিন : শহীদ দবির উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর সীমান্তের ওপারে ভারতের বাঘমারা ক্যাম্পে। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে এখান থেকেই বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁরা শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আবার ক্যাম্পে ফিরে যেতেন। সেদিন ছিল একাত্তরের ২০ অক্টোবর। ক্যাম্পে খবর আসে তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ। ছেলেকে দেখতে চেয়েছেন। খবর পেয়েই দবির রওনা হন। দুপুরে নেত্রকোনা শহরের আখড়া মোড় এলাকায় এসে বাসে উঠলে অবাঙালি রাজাকার মদিনা শেখ তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিনিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাদের। হায়েনার দল তাঁকে আটক করে নিয়ে যায় মোক্তারপাড়া ডাকবাংলো ক্যাম্পে। চলানো হয় দুর্বিষহ নির্যাতন। দুই দিন পর ২২ অক্টোবর বিকেলে অনেক মানুষের সামনে সদর উপজেলার চল্লিশা রেলসেতুর নিচে আনা হয় তাঁকে। গরু বেঁধে রাখার বাঁশের খুঁটি দিয়ে তাঁর দুটি পায়ের পাতা মাটিতে গেঁথে ফেলে। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে বললে নির্মম অত্যাচার সহ্য করেও দবির দীপ্ত কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে হত্যার পর লাশটি নদীতে ভাসিয়ে দেয় ঘাতকের দল। লাশের সন্ধান পাননি স্বজনেরা। দবির উদ্দিন ঢাকার ব্রাদার্স ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত স্বনামধন্য ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। এছাড়া তিনি পূর্বপাকিস্তানে ১০০ মি. দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তাঁর সহপাঠী ও সহযোদ্ধা তখনকার মুজিব বাহিনীর নেত্রকোনা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী জানান, তাঁরা যুদ্ধের সময় একসঙ্গেই বাঘমারা ক্যাম্পে ছিলেন। হানাদার সেনারা দুই দিন নির্যাতন চালিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে তাঁকে হত্যা করে।দবির উদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৯৪৬ সালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদ গ্রামে। তাঁর বাবা মোশারফ হোসেন ও মা বেগম আমিরুন্নেছা হোসেন গৃহিণী। ১৯৮৬ সালে মোহননগঞ্জ পৌর শহরে রাস্তার নামকরণ করা হয।মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও নেত্রকোনা দত্ত উচ্চবিদ্যালয়ে তাঁর প্রতিকৃতিখচিত স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।[১৯]

সরাসরি রণাঙ্গণে মোহনগঞ্জ থানার যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ বাংগালীর হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা বাস্তবায়নে জীবন উংসর্গ করেছেন তাদের তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলঃ

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ একদিল হোসেন। তিনি বরান্তর প্রামের আব্দুল খালেকের পুত্র ছিলেন। ইসলাম উদ্দিন খান (কালা মিয়া) কোম্পানীর এই যোদ্ধা বিজয়পুর সীমান্ত ক্যাম্প যুদ্ধে মারাত্মক আহত হয়ে কয়েক দিন পর শাহাদাত বরণ করেন। বরান্তর মৌজায় তাঁর কবর রয়েছে।

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ উসমান গনী। পানুর গ্রামের আব্দুল জব্বারের পুত্র ছিলেন তিনি। কলমাকান্দা যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নূর আহম্মদ। পালগাঁও গ্রামের আব্দুল হেকিমের পুত্র ছিলেন তিনি। তিনি শিববাড়ি সীমান্ত ক্যাম্প যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আনোয়ার আলম খান চৌধুরী। তিনি মোহনগঞ্জ পোস্ট অফিস রোডের মোফাজ্জল হোসেন খান চৌধুরীর পুত্র ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান গ্রæপের এই বিএলএফ সদস্য পরপর কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অসুস্থতাবশত: শহীদ হন। ভারতের কোথায় তাঁকে কবর দেয়া হয়েছে জানা যায়নি।

৫। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিপাহী নুরুল হুদা সিদ্দিক। তিনি নলজুরী গ্রামের খালেক নেওয়াজের পুত্র ছিলেন। সামরিক বাহিনীর এই সদস্য কুমিল্লা যুদ্ধে শহীদ হন। কুমিল্লায় তাঁর কবর থাকলেও এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

পূর্বধলা থানা 

এখন পর্যন্ত পূর্বধলা থানার ১৬ জন শহীদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের ১ জন রণাঙ্গণের বাইরে এবং ১৫ জন সরাসরি রণাঙ্গণে শহীদ হয়েছেন।

রণাঙ্গণের বাইরে পূর্বধলা-এর যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ বাংগালীর হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা বাস্তবায়নে জীবন উংসর্গ করেছেন তাদের তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলঃ

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রভাষক শহীদ আরজ আলীঃ [২০]দুর্গাপুরের গুজিরকোণার কুখ্যাত দালাল কিতাব আলীর কু-পরামর্শে একাত্তরের ১৩ আগস্ট পাকিস্তানি সেনারা নেত্রকোণা কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক আরজ আলী সাহেবকে কলেজের শিক্ষক হোস্টেল থেকে তাঁকে আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেনারা ১৬ আগস্ট তাঁকে হত্যা করে। এর আগে তাঁকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক অত্যাচার করা হয়।মো. আরজ আলীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানিরা অভিযোগ এনেছিল যে তাঁর গ্রামের বাড়িতে মুক্তিবাহিনী লুকিয়ে ছিল। ১৬ আগস্ট বেলা ১০টায় দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তীরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে এ ব্যাপারে আবার জিজ্ঞাসা করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জি সি দেবের ছাত্র। মিথ্যা বলতে শিখিনি।’ তার পরেই পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়।২০২০ সালে তৎকালীন সরকার তাকে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

সরাসরি রণাঙ্গণে মোহনগঞ্জ থানার যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ বাংগালীর হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা বাস্তবায়নে জীবন উংসর্গ করেছেন তাদের তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলঃ

১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তারা উদ্দিন বীর বিক্রম। নারায়ণডহর গ্রামের খোদা নেওয়াজ খানের পুত্র ছিলেন তিনি। বেঙ্গল রেজিমেন্টের এই যোদ্ধা হবিগঞ্জের যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরের খোঁজ পাওয়া যায়নি।[২১]

২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলী নেওয়াাজ। তিনি পাগলাকান্দা গ্রামের আব্দুল গফুরের পুত্র ছিলেন। তিনি ভালুকা থানার রায়ের গ্রাম যুদ্ধে সহ-যোদ্ধা আব্দুল জব্বারের সাথে শহীদ হন। এই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তাঁরও কবর রয়েছে।

৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল আজিজ। হোগলা গ্রামের মনির উদ্দিনের এই পুত্র পূর্বোক্ত ভালুকা থানার রায়ের গ্রাম যুদ্ধে সহ-যোদ্ধা আব্দুল জব্বারের সাথে শহীদ হন। এই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তাঁরও কবর রয়েছে।

৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আমিরুল ইসলাম ফেরদৌস। দত্তকুনিয়া গ্রামের আলহাজ্ব আমির উদ্দিনের এই পুত্র ঘোষগাঁও যুদ্ধে শহীদ হন। সেখানে তাঁর কবর রয়েছে।

৫। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সুরুজ আলী। দত্তকুনিয়া গ্রামের সমেদ আলীর এই পুত্র আব্দুল গনী কোম্পানীর একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন। গোয়াতলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হলে তিনি শহীদ হন। তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

৬। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ গোকুল চন্দ্র দেবনাথ। তিনি শাবাজপুর গ্রামের সতীষ চন্দ্র দেবনাথের পুত্র ছিলেন। ঘোষগাঁও-জিগাতলা যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। সেহড়া গ্রামে তাঁর মরদেহ দাহ করা হয়।

৭। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বিনোদ আলী। জারিয়া গ্রামের দেনত আলীর পুত্র ছিলেন তিনি। তাঁর তথ্য সঠিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

৮। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হাবিলদার মিয়া হোসেন। তিনি গরোয়াকান্দা আলী হোসেনের পুত্র ছিলেন। ইপিআর-এর এই বীর যোদ্ধা দিনাজপুর যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর কবরের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

৯। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ অনিল সাংমা। হোগলা গ্রামের গিরিণ সাংমার এই পুত্র দীপক সাংমা কোম্পানীর অধীনে ফুলপুরের তালদীঘি যুদ্ধে ১৭ নভেম্বর শহীদ হন। তাঁর সমাধির তথ্য এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

১০। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জসিম উদ্দিন। হাপানিয়া গ্রামের লিযাকত আলীর পুত্র ছিলেন তিনি। তাঁর তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

১১। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল মতিন। হোগলা গ্রামের তাহির উদ্দিনের এই বীর পুত্রের তথ্য নষ্ট হয়ে গেছে।

১২। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আক্রম আলী। হোগলা গ্রামের আমছর আলীর পুত্র ছিলেন তিনি। এই বীর যোদ্ধা ভালুকা থানার রায়ের গ্রাম যুদ্ধে শহীদ হন। এই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তাঁর কবর রয়েছে।

১৩। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সামছ উদ্দিন। তিনি পাইকুড়া গ্রামের গুঞ্জর আলীর পুত্র ছিলেন। তাঁর সঠিক তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

১৪। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শহর আলী। শ্যামগঞ্জের শালদিঘা গ্রামের মিয়াফর আলীর পুত্র ছিলেন তিনি। তাঁর তথ্য পাওয়া যায়নি।

১৫। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল জব্বার। তিনি হোগলা গ্রামের সন্তান ছিলেন। এই বীর যোদ্ধা ভালুকা থানার রায়ের গ্রাম যুদ্ধে শহীদ হন। এই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তাঁর কবর রয়েছে।[২১]

খালিয়াজুরী থানা 

উল্লেখ্য যে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় খালিয়াজুরী থানা হানাদার মুক্ত ছিল। হাওরের জল-পানির এলাকায় বর্বর পাক বাহিনীরা বের হতে ভয় পেতো। এখন পর্যন্ত খালিয়াজুরী থানার ১ জন  শহীদের নাম পাওয়া গেছে। তিনি হচ্ছেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ অলি চন্দ্র সরকার। তিনি পাথরা গ্রামের বঙ্গবিহারী সরকারের পুত্র ছিলেন। সিলেটের তামাবিল যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর সমাধির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কিন্তু এই তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। তালিকাটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক প্রখ্যাত সাহিত্যিক স্বনামধন্য অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের “স্মরণে বঙ্গবন্ধু “ বই থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আপডেট করা হয়েছে। তালিকাটি তেরীতে সহায়তা করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস আহম্মদ কোরাইশী এবং উনার বড়ভাই উইং কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন চন্দ্র সরকার।

তথ্য সূত্রঃ

  1.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (ফেব্রয়ারী ২০২0),” নেত্রকোনা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা ”, স্মরণে বঙ্গবন্ধু
  2.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (ফেব্রয়ারী ২০২0),” নেত্রকোনা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা ”, স্মরণে বঙ্গবন্ধু
  3.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (03rd Jan 2026)”নেত্রকোনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস”
  4.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(মে ২০২৩). নেত্রকোণার শহীদ মিনারের ইতিকথা, বিজয় একাত্তর সপ্তম সংখ্যা পৃষ্ঠা  ৮১
  5.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২). জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা, বিজয় একাত্তর পৃষ্ঠা 129-132
  6.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(সেপ্টেম্বর ২০২২),“শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতিহাস”, বিজয় একাত্তর, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৮
  7.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”,বিজয় একাত্তর, পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
  8.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(এপ্রিল ২০২২). “),”শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতহিাস,”, শহীদ মেহের আলীর সংক্ষিপ্ত জীবনী পৃষ্ঠা 1-3(সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১,নেত্রকোণা জেলা শাখা।)
  9.  রহমান, গোলাম এরশাদুর,” মুক্তি সংগ্রামে নেত্রকোনা”
  10.  ইসলাম, মঈনউল,” ‘মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনায় গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধন”, নেত্রকোনার সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস নেত্রকোনা, জেলা প্রশাসন
  11.  চৌধুরী,বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান ( ১৪ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”, আলোরপথে ৫তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৫-২০
  12.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১-১২
  13.  Khan, Ashraf Ali  Khoshru (23 May 2005). “Memorial discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Ittefaq. p. 8.
  14.  Khan, Motiur Rahman (18 May 2005). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Samachar.
  15.  Shamsusjuha, Md (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  16.  Khan, Fazlur Rahman Khan (25 June 1994). “Memorial Discussion on Bir Muktijudha Meher Ali”. The Daily Dinkal. p. 6.
  17.  আহমেদ সামির (15 Jan 2026)” মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব-২
  18.  আহমেদ সামির (15 Jan 2026)” মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব১
  19.  খান, আলী আহাম্মদ আইয়োব,”নেত্রকোনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস”, গতিধারা
  20.  আচার্য, সাংবাদিক জয়ন্ত,( ১৪ ডিসেম্বর ২০২১),মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধীজীবিবৃন্দ” সাপ্তাহিক-২০০০ পৃষ্ঠা ২০-২৪
  21.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(মে ২০২২),”শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতহিাস”, মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা পৃষ্ঠা ২০২-২০৫

0

Subtotal