বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব:) এম এ মোত্তালিব

আহমেদ সামির

সাব-সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব:) এম এ মোত্তালিব নেত্রকোনা সদর থানার দরিজাগী গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বরে  নানার বাড়ীতে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা- মাওলানা হাফিজ উদ্দীন ও মাতা – হাফিজা বেগম। মাওলানা হাফিজ উদ্দীন সাহেবের বাড়ি ছিল নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার কাজলা বৈরাটী  গ্রামে।  ৫ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।

শিক্ষা ও কর্মজীবন : তিনি গ্রামের কাজলা বৈরাটী সরকারী প্র্রাইমারী  স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর  আঞ্জুমান হাইস্কুল থেকে ১৯৫১ সালে ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সেখান থেকেই ১৯৪৯ সালে মেট্রিক পাশ করেন এবং নেত্রকোণা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন ।  ১৯৫৭ সালের ৭ই মে  ২১ বেলুচ রেজিমেন্টে  কমিশন লাভ করেন।  ১৯৬৫ সাল হতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বেলুচ রেজিমেন্টেই ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারী তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পান। মুক্তি লাভের পর সিলেটে ধার কর্য করে লাকড়ী জ্বালানী কাঠ ক্রয় করে বিক্রি করতেন। পরে একটা জমি ক্রয় করে তাতে ধান চাষ করতেন।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান:  ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২শে ফেব্রুয়ারীর মিছিল হতে  নেত্রকোণার তেরী বাজার থেকে অন্যান্যদের সাথে গ্রেফতার হন।তিনি  ঐ সময়ে যাদেরকে নেতৃত্ব দিতে দেখেছেন তারা হলেন সর্বজনাব- আব্দুল খালেকসানাউল্লাহ নূরী, ফজলুর রহমান খান, লুৎফর রহমান,আলতাফুর রহমান, রফিক উদ্দীন প্রমুখ। ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যার পর তিনি মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সংগঠিত করতে থাকেন এবং এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর মোত্তালিবের[1] [2][3][4][5][6](পরবর্তীতে যিনি সাব-সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন) নেতৃত্বে কয়েকশ’ সামরিক কর্মকর্তা ও ইপিআর সদস্য দুগনৈ গ্রামে আসেন। দুগনৈ গ্রামে এসেই সাক্ষাত হয় জনাব মেহের আলীর সাথে। জনাব মেহের আলী [7]ছিলেন তার এলাকার ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই।  জনাব মেহের আলী ছিলেন নেত্রকোনা মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য, মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত[8] সদস্য এবং জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক’৭১পর্যন্ত। মেহের আলী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে ভারতের মহেশখলা যাওয়ার পথে মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মধ্যনগর সহ আশপাশের এলাকার ছাত্র যুবকদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করবার জন্য। মহেষখলাতে মুক্তিযোদ্ধা ও ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনার পাশাপাশি তিনি মধ্যনগর থানার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামের ছাত্র, যুব ও সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সংগঠিত করেন এবং ধান, চাল সহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ক্যাম্পে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন যা কিনা যুদ্ধের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রসদ। এলাকার মানুষ মেজর সাহেবের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেখে মুক্তিযু্দ্ধে যাওয়ার জন্যে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। মেজর মোত্তালিব এলাকার মানুষকে যার যা আছে তা নিয়ে মুক্তিযু্দ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্যেও আহবান জানান। জনাব মেহের আলী মুক্তি মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের জনাব আকিকুর রেজা ও আব্দুল আওয়ালসহ অন্যাণ্য নেতৃবৃন্দের নিয়ে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং পরের দিন তাদেরকে নৌকায় করে নিরাপদে গন্তব্যে   যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। মেজর মোত্তালিব ৪ ও ৫নং সেক্টরে তিনি বহু অপারেশন করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, জৈন্তাপুর অপারেশন। জৈন্তাপুর অপারেশন করার পরিকল্পণা করা হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে। তার পরিবার তখন তামাবিল সীমান্ত থেকে ১৩ কিমি ভেতরে সকাপুন্জিতে।  প্রায় ৮০০ সৈন্য মুক্তারপুরের উদ্দশ্যে পাঠিয়ে তিনি বাড়ীতে যান। রাত তিনটায় তিনি খাওয়া সেড়ে যুদ্ধ শুরু করেন।  যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তিনি একটা গাছের আড়াল থেকে মেশিনগান চালাচ্ছিলেন। সাথে ছিল একজন নেপালী। গাছ ভেদ করে একটা গুলি তার গলায় ও নেপালীর দুই উরুতে দুটি গুলি লাগে।  নিজের ক্ষত স্থান  হাত দিয়ে চেপে ধরে নেপালীকে কাধে নিয়ে মেজর মোতালিব সাহায্যের জন্যে নিরাপদ স্থানের দিকে যাচ্ছিলেন। সীমান্তের কাছাকাছি এলে ভারতীয় সৈন্যরা তাদেরকে শিলং হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় চিকিৎসার জন্যে।

মৃত্যু: বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব:) এম এ মোত্তালিব ১৯৯১ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।

পুরষ্কার ও সম্মানণা: ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute Silver Award-2025” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১-১২
  2.  ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫),” বীর মুক্তিযোদ্ধা ইজাজ আহমেদ চৌধুরী”, বিজয় একাত্তর ১১তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ২৯
  3.  চৌধুরী,বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান ( ১৪ডিসেম্বর ২০২৫),” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”, আলোরপথে ৫তম সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৫-২০
  4.  আহমেদ সামির (২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬)”  বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব:) এম এ মোত্তালিব 
  5.  হাসান, প্রধান বিচারপতি জনাব ওবায়দুল(এপ্রিল ২০২৩),” মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্প, মুক্তিযুদ্ধে মোহনগন্জ :মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্প ও ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ”, পৃষ্ঠা ১০১-১০৩
  6.  মেজর (অব.) এম এ মোত্তালিব( ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০০৭),”মুক্তিযুদ্ধের উত্তর -পূর্ব রণাঙ্গন”
  7.  চৌধুরী, হায়দার জাহান(২৩ ডিসেম্বর ২০২২),”শহীদ মেহের আলী একটি নাম, একটি ইতিহাস”,আলোর পথে,পৃষ্ঠা ৬১-৬৪
  8.  আহমেদ সামির (15 Jan 2026)” মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না পর্ব-২
0

Subtotal