বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান

গবেষক আহমেদ সামির

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সর্বদা আপোসহীন সৎ ও নির্ভীক রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে লোক সাহিত্যের অন্যতম গবেষকে পরিণত হন। তার জীবনের প্রথম বই ‘নেত্রকোনার বাউলগীতি’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। দলমতনির্বিশেষে  শ্রদ্ধাভাজন তার মত মানুষ  আজকের সমাজে বিরল।

জন্ম: ১৯৪৮ সালের ১০ জানুয়ারি গোলাম এরশাদুর রহমানের নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার নওহাল গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার এক সন্তান হাই কোর্টের এডভোকেট ও আরেক সন্তান রাজনীতিবিদ।

শিক্ষাজীবন: তিনি  মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে নেত্রকোনা সরকারী কলেজে ভর্তি হন।

রাজনৈতিক জীবন: স্কুল জীবনেই তিনি রাজীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কলেজ জীবনে এসে তুখোড় ছাত্রনেতায় পরিণত হন। ১৯৬২ সালে মোহনগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৭০ সালে নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি হন। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের ওই মহকুমার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি ছিলেন নেত্রকোনা জেলার মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) কমান্ডার। ১৯৭২ সালে তিনি ছাত্রলীগ ছেড়ে জাসদের রাজনীতিতে চলে যান এবং জেলার সাধারণ সম্পাদকের পদ নেন। তখন থেকে শুরু হয় তার আরেক জীবন। ১৯৭৩ সালের ১৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন এবং এক বছর জেলে থাকেন। ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু হয় তার হুলিয়া জীবন। ৬ বছর পর্যন্ত তিনি হুলিয়া জীবনে ছিলেন। ভিন্ন মতাদর্শের প্রতি তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তাই তিনি এবং তার স্ত্রী তখন জাসদের (রব) রাজনীতিতে যুক্ত থাকার পরও । তার বড় সন্তান গোলাম কামরাজ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াতে কোন আপত্তি করেননি। গোলাম এরশাদুর রহমানের জীবদ্দশায় তিনি কোনো দিন ছেলের চিন্তার স্বাধীনতায় হস্তপেক্ষ করেননি। জনাব গোলাম এরশাদুর রহমান রাজনৈতিক হিংসা বিদ্বেষের অনেক উর্ধে ছিলেন। ছিলেন ভিন্ন মতাদর্শ ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এ বিষয়ে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক,প্রাবন্ধিক  অধ্যাপক ননী গোপল সরকারের[1] প্রবন্ধ “স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী “ থেকে জানা যায়,২০০৫ সালের ১৯ মে, শহীদ মেহের আলী স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে নেত্রকোণা প্রেসক্লাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: শামছুজ্জোহা[2] সভাপতিত্বে এক আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমান তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তোলে ধরেন। তিনি অকপটে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন  নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে একমাত্র শহীদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন) বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলীর  হাত ধরে তিনি ১৯৬২ সালে রাজনীতিতে পদার্পন করেন। ষাটের দশের শুরু  থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মেহের আলী সাহেবের নেতৃত্ব ও দক্ষতার কথা বলে জনাব এরশাদুর রহমান- মেহের আলী সাহেবকে তাঁদের রাজনৈতিক গুরু বলে আখ্যায়িত করেন। “ ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি এমন সম্মান জ্ঞাপনের ঘটনা আজকের সমাজে বিরল।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি: নেত্রকোনা সরকারি কলেজে পড়াকালীন তিনি ‘সোনার তরী’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন। যে পত্রিকায় মোহনগঞ্জ এবং নেত্রকোনার অনেকেই লিখতেন। বিশিষ্ট গবেষক  আলী আহাম্মদ খান আইয়োবের ‘ময়মনসিংহের সাময়িকী ও সংবাদপত্র’ গ্রন্থের ২১২ পৃষ্ঠায় উলেস্নখ করেছেন, ‘১৯৭২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর (১৫ আশ্বিন, ১৩৭৯ বঙ্গাব্দ) নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের মুখপত্র হিসেবে বিপস্নবী কণ্ঠ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটি ছিল পাক্ষিক। বিপস্নবী কণ্ঠের সম্পাদক ছিলেন হাফিজুর রহমান খান ওয়ারেছ। সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন তাজুল ইসলাম। গোলাম এরশাদুর রহমান ছিলেন পত্রিকাটির পরিচালক। ছাপা হতো নেত্রকোনার সিদ্দিক প্রেস থেকে। ট্যাবলয়েড আকারের ৮পৃষ্ঠা নিয়ে প্রতি পক্ষে বের হতো। প্রতি কপির মূল ছিল ০.২৫ পয়সা।’হুলিয়া জীবনে নেত্রকোনার বিভিন্ন গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়ান তিনি। চোখের পড়ে নেত্রকোনার লোকায়ত জীবনের কথা। ওই সময়ে বাউল গান তথা লোকায়ত সংস্কৃতির নানা উপাদান সংগ্রহ করেন এবং লিখতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন নেত্রকোনা লোকায়ত সংস্কৃতি এবং রাজনীতির অনিবার্য মানুষ। ১৯৯৪ সালে তার জীবনের প্রথম বই ‘নেত্রকোনার বাউলগীতি’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশ হয় – মুক্তি সংগ্রামে নেত্রকোনা, নেত্রকোনার লোক পরিচয়, লোকায়ত নেত্রকোনা, নেত্রকোনার লোকায়ত গল্পগুজব,  মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস সোমেশ্বরীর তীরেসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বই।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে তৎকালিন নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসাবে নেত্রকোণা স্বাধীনতাকামি ছাত্র যুবকদেরকে সংগঠিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহন করেন।মোহনগঞ্জ এলাকার এমপি  ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর নেতৃত্বে গোলাম এরশাদুর রহমান মোহনগঞ্জ আওয়ামীলীগের নেতা সর্বজনাব আব্দুল কদ্দুছ আজাদ, মীর্জা গণি, আমির উদ্দিন আহমেদসহ মীর্জা তাজুল ইসলাম,রফিকুল ইসলাম, মন্তাজ উদ্দিন আরো কয়েকজন মিলে নৌকাযোগে মোহনগঞ্জের ভাটি এলাকার গ্রামে-গ্রামে ঘুরে-ঘুরে জনগণকে সংগ্রাম কমিটির সাথে ঐক্যবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে তিনি ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে ভারতের দেরাদুন ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিশেষ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে ১১ নং সেক্টরে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) মুজিব বাহিনীর মহেষখলা সাবসেকটরের কমন্ডার হিসাবে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংঘঠিত করে দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করার মহান দায়িত্ব পালনসহ হানাদার বাহিনীর বিরোদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন ।

ঐতিহাসিক গণআদালত: নেত্রকোনায় ঐতিহাসিক গণআদালত: জাতীয় সাহিত্যিক বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত লেখক জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর অমর গ্রন্থ শতাব্দীর দুই দিগন্ত ও বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম এরশাদুর রহমানের মুক্তিসংগ্রামে নেত্রকোনা,বীরমুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী-এর মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা বই থেকে জানা যায়, “স্বাধীনতার পর পরই মোক্তার পাড়ার মাঠে বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সংগ্রামী জনতার সমাবেশে বীরমুক্তিযোদ্ধারা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের কাছে নিখুজ মেহের আলীর সন্ধান চান এবং প্রিয় নেতাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বলেন।যদি ফিরিয়ে দেয়া না হয় তবে তারা নিজেরাই এর বিচার করবেন। এই সভাতেই ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তথা গোলাম এরশাদুর রহমান,হায়দার জাহান চৌধুরীআশরাফ আলী খান খসর,শামসুছজোহা,জামাল উদ্দিন আহমেদ,শাফায়াত আহমেদ,নুরুল আমিন,সাবেক এমপি,জালাল উদ্দীন তাং,হাদীস উদ্দন চৌধুরী-সাবেক পুলিশের আজি প্রমুখ বীরমুক্তিযোদ্ধারা অফিসিয়ালি জানতে পারেন যে, জনাব মেহের আলী মহেষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন কালে ১৭ ই মে ১৯৭১ সালে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হয়েছেন। এই সংবাদ শোনার পর পরই বীরমুক্তিযোদ্ধারা  বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং ঐ সভাতেই সিদ্ধান্ত হয় হত্যার বিচার করার। ঐ সভা থেকেই ৫০ জন  বীরমুক্তিযোদ্ধার একটি দল হত্যাকারীর সন্ধানে বেড়িয়ে যায় এবং হত্যাকারীকে তথা সিকানদার নূরীকে (যার বিরুদ্ধে নুরীর প্রতিবেশী একজন প্রাইমারী শিক্ষক, শহীদ মেহের আলীসহ  বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,র্ধষন ও লুটের অভিযোগ ছিল। নূরী ছিল ঐ অঞ্চলের ত্রাস)  প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। এর মাধ্যমে বীরমুক্তিযোদ্ধারা  নেত্রকোনার মাটিকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের  রক্তে কলংকিত হওয়ার হাত হতে রক্ষা করেন। এরপর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর, মতান্তরে ২৩ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য মোহনগঞ্জের লুহিয়ার মাঠে গণআদালত বসে। যার সভাপতি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গণপরিষদ সদস্য প্রয়াত ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন গোলাম এরশাদুর রহমান। সেই গণআদালতে বেশ কয়েকজনকে মৃতু্যদন্ড দেওয়া হয় এবং ওইদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তা কার্যকর করে। ইতিহাসের পাতায় এই দুটি ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে।

পুরষ্কার ও সম্মানণা: ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute[3] [4]Silver Award-2023” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়।

তথ্যসুত্রঃ

  1.  সরকার, অধ্যাপক ননী গোপাল (২৩ ডিসেম্বর ২০২২),” স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শহীদ মেহের আলী”, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা , পৃষ্ঠা ১৩-৩৮
  2.  বিশ্বাস, সাংবাদিক প্রিয়ঙ্কর(২৩ ডিসেম্বর ২০২২), “মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মো:শামছুজ্জোহা, বিজয় একাত্তর ষষ্ঠ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৯৩-১০০
  3.  চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান(সহ-সভাপতি, নেত্রকোণা ক্লাব),“মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় অতন্দ্র,প্রহরীঃ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ইনস্টিটিউট, অস্ট্রেলিয়া”, নেত্রকোণা জার্নাল,২৪/১০/২০২৩
  4.  1.   বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু আক্কাস আহমেদ(সভাপতি-নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ),“শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা- ২০২২”, Rajdhani TV, 04/10/2023

 

0

Subtotal