মৃনাল কান্তি চক্রবর্তী
ঘড়ির কাটা সকাল ৭টা ছুই ছুই।পূর্ব আকাশে শীতের কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের লাল আভা ধীরে ধীরে উদিত হচ্ছে।জানালা বন্ধ থাকলেও আধাপাকা টীনের ঘরের ভঙ্গুর জানালা ভেদ করে সকালের সূর্য কিরন অগোছালো বিছানায় শায়িত বিজয়ের চোখে মুখে পড়ে কিছুটা যেন তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বিজয়ের মা মালতি দেবী বার বার ছেলেকে ডাকছিল। তবে ক্ষীন স্বরে, কারণ মধ্যরাতে ফেরা বিজয়ের আরেকটু ঘুম দরকার। কিন্তু আজতো ১৬ ডিসেম্বর ! বিজয়ের তো এতো বেলা অব্দি বিছানায় থাকার কথা নয়! ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রæয়ারি কিংবা ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনার বা স্মৃতি সৌধের শীর্ষ চুড়ায় ফুল না দিলে তো বিজয়দের মন ভরে না। আজ তাহলে কি এমন হলো, বিজয় এখনো বিছানায় ঘুমের রাজ্যে মগ্ন। মালতি দেবী কাছে গিয়ে বিজয়কে আবার ফিসফিসিয়ে ডাকে । বিজয়, উঠ বাবা, কখন সকাল হয়ে গেছে! কখন যাবে স্মৃতিসৌধে? আমাকেও তো মাঠে যেতে হবে, প্রতি বছরই যাই, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে একটি রজনীগন্ধার ছড়া সহ কিছু উপহার গ্রহণ করি। ওপাশ ফিরে বিজয় বলে আমাকে ডেকোনা মা ঘুমাতে দাও। আমি আজ খুব বেশি ক্লান্ত, বেশি করে ঘুমাব। মালতি দেবী খুব বেশি চাপাচাপি করেন নাই।ছেলে যখন যেতে চাচ্ছেনা তখন ঘুমিয়ে নিক কিছুক্ষণ। তবে
রহস্যটা কি , কি এমন হলো যে বিজয় আজ স্মৃতিসৌধে যাবে না । ওপাশ ফিরে বালিশে মুখ গুজে বিজয় আবার ঘুমের রাজ্যে যেন হারিয়ে যায়।খুব আস্তে করে দরজাটা টেনে দিয়ে তার মা ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ঘুমের মধ্যে বিজয় যেন স্বপ্নে তার অতীত কে ফিরে পায়। ১৯৭১ এর রক্তিম মার্চ মাস। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! কেউ আমাদের আর দাবিয়ে রাখতে পারবেনা। বিজয়ের বয়স তখন ৭ কিংবা ৮ হবে। সবকিছু তার
স্মৃতিতে অমলিন। তাদের বাড়িতে একটি কালো রঙের বড় সাইজের পুরাতন রেডিও ছিল । তার বাবা প্রতিদিন খবর শোনার সময় হলে রেডিওটা ছাড়তেন। পাশের বাড়ির নিতাই কাকা, বিমল দাদা কিংবা পশ্চিম পাড়ার সিরাজ চাচাও আসতো খরব শোনার জন্যে। রেডিওটা ছাড়লেই শোনা যেত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জাগরনী গান। খবরের বেশীর ভাগই থাকতো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের সারমর্ম। কি করা উচিত! বিভিন্ন এলাকায় মুক্তি বাহিনী গঠনের খবর। বাবা, নিতাই কাকা, বিমল দা এবং সিরাজ চাচারা প্রায়ই নিচু স্বরে আলাপ করতো। বিজয় কাছে গেলেই তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হতো। তবে কিছু একটা হচ্ছে সেটা বিজয় ভালোই বুঝতে পারতো। ইদানিং পশ্চিম পাড়ার তাহের মিয়ার এ পাড়ায় আগমনটা যেন একটু বেশী বেড়ে গেছে। প্রায়শই দেখা যেত দু/চারজন বখাটে ধরনের ছেলে নিয়ে বাড়ির পুকুর পাড় কিংবা বৈঠক ঘরের সামনে তার আনাগোনা বেশী । বিজয় দেখতো তাহের মিয়া আসলেই তার বাবা সহ সকলেই কিছুটা নিরব হয়ে যেত , তার সামনে তাদের আলোচনা বেশীদূর এগুতো না।
২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তান ঘাতক বাহিনীর অতর্কিত হামলায় ইতিহাসের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর সারা বাংলাদেশ যেন কেপেঁ উঠে। রেডিও এর খবরে শুধুই লাশের খবর আসছিল। তবে মাঝে মাঝে মুক্তি বাহিনীর প্রতিরোধের খবরও পাওয়া যাচ্ছিল। মার্চের ২৮ কিংবা ২৯ তারিখ হবে। বিজয়দের পুকুর থেকে হঠাৎ তাহের মিয়ার সাঙ্গপাঙ্গদের মাছ ধরতে দেখা গেল। বিজয়ের বাবা না জানিয়ে মাছ ধরার কারন জানতে চাইলে পান খেয়ে লাল করা মুখে মুচকি হাসি দিয়ে তাহের মিয়া বলে “ দাদা, দেশের অবস্থা বালানা, কহন কিতা অয় কওয়া যায়? পুসকুনিত অততা মাছ রাইখ্যা লাভ কি! আপনেও খাইলেন, আমরাও খাইলাম।” বাবার অসহায় রুগ্নমূর্তি দেখে পাশে দাড়ানো বিজয়ের ভয় হচ্ছিল। কি হতে যাচ্ছে দেশে। পরের দিন পুকুর পাড়ের নারকেল গাছে উঠে ডাবগুলো পেড়ে নিতে দেখা গেল। কিন্তু সবাই যেন অসহায়। সন্ধায় বিমল কাকা, নিতাই কাকা ও সিরাজ চাচা আসলেন। সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ছায়া দেখা যাচ্ছে।
শুকনো মুড়ি আর লাল চা হাতে মা এসে সিরাজ চাচাকে বলল “ সিরাজ ভাই এই দেশে মনে হয় আর থাকা যাইতো না! সিরাজ চাচা মাকে অভয় দিয়ে বলেন বেশী চিন্তা করার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধুর ঘোষনায় দেশের সব জায়গায় প্রতিরোধ তৈরী হয়েছে। মুক্তি বাহিনী এখন
অনেক সংগঠিত। নিতাই কাকা বলে, তাহের মিয়ার পাওয়ারটা যেন একটু বেশী বেড়ে গেছে। ডাব নেয়া, মাছ নেয়া , ফসল কেটে নেয়া , কি চাইছে সে। বিমল কাকা বলে এতো উত্তেজিত হলে চলবে না। আমাদের ঠান্ডা মাথায় এগুতে হবে আমি পাশের গ্রামের হযরত ভাইয়ের সাথে আলাপ করেছি। আজ রাতেই একটি কঠিন সিদ্বান্ত নিতে হবে। প্রতিটি আলোচনায় বিজয় পাশে থেকে সব শুনতো। তার ভাবনা কি এমন কঠিন সিদ্বান্ত নিতে যাচ্ছে! ৩১ শে মার্চ ১৯৭১ সালের সুর্যোদয়টা ছিল বিজয়দের জীবনে অন্ধকারে ঢাকা। সকালে উঠেই রান্না বান্না শেষে তার মাকে জিনিষ পত্র গুছাতে দেখল বিজয়। কাসার থাল, গøাস, বাটি, কলসী সহ বিভিন্ন মুল্যবান জিনি বস্তায় ভরে মাটির নিচে রাখার ব্যবস্থা করছিল পরিবারের সবাই। গরু ছাগল সহ অন্যান্য সম্পদ পাশ^বর্তী কারো বাড়িতে রাখার পরিকল্পনা হলো। আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিষ বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো। মায়ের মনটা আজ ভালো নেই। বার বার তুলসী তলায় প্রনাম করছিল আর কেদেঁ কেদেঁ ভাসিয়ে দিচ্ছিল। বাবাও যেন নির্বাক হয়ে গেছে। বেশী কিছু বলছে না। বার বার পুকুর পাড়, বাড়ির পিছনের আঙিনা অশ্রæসজল চোখে দেখছিল। হয়তো পিতৃপুরুষের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া তীব্র কষ্ট তাকে কুড়েঁ কুড়ে খাচ্ছিল। সারাদিন একটা গুমোট পরিবেশে কাটার পর সন্ধা হওয়ার সাথে সাথে মা সবাইকে খেতে ডাকলেন। দ্রæত খাওয়া দাওয়া শেষ করে উঠতেই দেখি সিরাজ চাচা হযরত চাচা হাজির। অপেক্ষায় ছিলাম বিমল দাদা ও নিতাই কাকার পরিবারের জন্য। কিছুক্ষণ পর দেখলাম মাথায় ও কাধেঁ ব্যাগ/বস্তা নিয়ে ওরা সবাই এসে হাজির হলো। সবার মুখ মলিন। নিতাই কাকার মেয়ে আমার খেলার সাথী মুক্তাকে দেখলাম জড়সড় হয়ে বসে আছে। সিরাজ চাচা বলল আর দেরী করা যাবেনা। এক্ষুনি রওয়ানা দিতে হবে। বিজয় জিজ্ঞেস করল কোথায় যাব চাচা? সিরাজ চাচা উত্তর দেয়ার আগেই নিতাই কাকা বলল অজানার
উদ্দেশ্যে…! বিজয় যেন ধাক্কা খেল! অজানার উদ্দেশ্যে! সবাই মিলে রাত্তিরে কোথায় চলছি আমরা। নিজের মতো করে সাজানো বাড়ি, পুকুর, পোষা কুকুর কিংবা বিছানার সঙ্গী সাদা বিড়ালটাকে রেখে? হযরত চাচা বলল সাবধানে যেতে হবে, তাহের মিয়ার সাঙ্গপাঙ্গরা ঘুরাঘুরি
করছে ওরা টের পেলে সমস্যা হবে। অবশেষে ভবিষৎতের স্বপ্নটাকে অন্ধকারে ফেলে এক বুক ব্যাথা, হতাশা আর তীব্র কষ্টকে সাথে নিয়ে অজানার প্রান্তরে ছুটে চলা! সিরাজ চাচা বললো একটু জোরে পা চালাতে হবে। রাত পোহাবার আগেই বারহাট্রার শেষ সীমানা চিরাম পার হয়ে সিলেট জেলার পাইকুরাটী বা শুনই গিয়ে পৌছাতে হবে। ওখানে সারাদিন বিশ্রাম নিয়ে পরের রাতে নৌকায় চড়ে মহিষখলা শরনার্থী শিবিরে পৌছাতে হবে। সবাই জোরে হাটঁেতে পারছেনা। কারো মাথায় বস্তা ভরা মালামাল কারো বা কোলে কিংবা ঘাড়ে শিশু বাচ্চা। সবচেয়ে বেশী কষ্ট হচ্ছে ৬ মাসের গর্ববতী রতœা বৌদির। হাটঁতে হাটঁতে বার বার হোচঁট খাচ্ছিল সে। বিমলদা মাঝে মাঝে তাকে হাত ধরে সরু রাস্তা পার করছিল। বারহাট্টা পার হয়ে চন্দ্রপুর গুদারা ঘাটে এসে বিড়ম্বনায় পড়তে হল। ঘাটে কোন নৌকা নেই। কিভাবে নদী পাড় হবো! নিতাই কাকা কিছুটা ভাটিতে গিয়ে গলা হাকিঁয়ে ডাকছিল। আচমকা নদীর ওপার থেকে ৩ ব্যাটারী লাইটের আলো অন্ধকার ভেদ করে সকলের চোখে মুখে লাগলো। ওপাশ থেকে চিৎকার করে কেউ একজন বলছে “ কেডা আপনারা! অহন নৌকা লইয়্যা আওন যাইতো না, পশ্চিম পাড়ার মাতবর সাব না কইর্যা গেছে রাইতে যেন কাওরে পার না করি, যুদি হেইল্যা জানতো পারে তাইলে আমার খবর আছে” নিতাই
কাকা নিজের পরিচয় দিয়ে বলার পর মাঝি বলদাস বলল “ বাবু আপনেরা! বুঝতাম পারছি। ঘাটে নৌকায় তুলা যাইতো না একটু দক্ষিনে ভাটিতে আয়ুন তা অইলে পাড় করতাম পারবাম, না অইলে সমস্যা আছে”। অবশেষে রাস্তা থেকে নেমে একটু দক্ষিণে গিয়ে নদী পাড় করে পুনরায় অজানার পথে হেটেঁ চলা। ওপারে গিয়ে আরো একটি দল পেলাম।নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধা সহ ওই দলেও ১৫/২০ জন হবে। বাবা কাকাদের সাথে তারা যেন কি বলছে। অবশেষে সারারাত হেটেঁ সাবেক সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী পাইকুরাটী গ্রামে আশ্রয় নেয়া। রতœা বৌদি যেন গিয়েই শুয়ে পড়েছে। মায়ের মুখটা এখনো মলিন। ভিটো ছাড়ার কষ্ট আর সারারাতের হাটাঁর ক্লান্তি যেন মাকে কাবু করে ফেলছে। সারাদিন আশ্রয়দাতার বাড়িতে থাকার পর সন্ধা হওয়ার সাথে সাথে পাইকুরাটী থেকে কিছু পথ হেটেঁ সুনই গিয়ে নৌকায় উঠলাম। আজকে আর বেশী হাঁটঁতে হয় নাই। ছাউনি সহ পাল তোলা নৌকায় উঠে যেন ক্লান্তি সব ধুয়ে গেল। নৌকা ছাড়ার পর মধ্যনগর, দক্ষিণ বংশীকুন্ডা টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ি দিয়ে অবশেষে মহিষখলা বাজারের নিকট পৌছা। তখন ভোর আসন্ন। দূরের মসজিদে আজানের ধ্বনি ভেসে উঠল। অন্ধকার ভেদ করে যতোই আলোর শিখা ফুটে উঠছে দূরের পাহাড়ের চুড়াটা যেন ততই কাছে মনে হচ্ছে। সকালের সুর্য উঠার সাথে
সাথেই আমরা মহিষখলা বাজার বামপাশে রেখে পাহাড়ী পানির ছরার পাশ দিয়ে পৌছে গেলাম মহিষখলা ক্যাম্পে। নিতাই কাকা ও বাবার পরিচয় সুত্রে খুব সহজেই একটি খুপরী ঘর পেয়ে গেলাম আমরা। অন্যদের ও খুপরী ঘরের ব্যবস্থা হলো। বাবার সাথে কি যেন কানা কানি কথা বলে একে অপরকে গলা জড়িয়ে অশ্রæসজল চোখে সিরাজ চাচা ও হযরত চাচা বিদায় নিল। মা সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিয়ে আসা বস্তা খুলে খাওয়ার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি ও অন্যদের উপর লাকড়ী সংগ্রহের দায়িত্ব পড়লো। লাকড়ী আনতে গিয়ে কিছু পাহাড়ী কাঠ আলু ও সংগ্রহ করে আনলাম।
বেশীদিন আর মহিষখলা ক্যাম্পে থাকা হলোনা। এসময় দ্রæত গতি মহিষখলা ক্যাম্পে কলেরা ছড়িয়ে পড়ছিল।তাই বাবা কাকাদের সিদ্বান্ত হলো দূর্গাপুর সীমান্তের ওপাড় বাঘমারা যাওয়ার। ওখানে আমাদের এলাকার লোক বেশী আছে। অবশেষে একদিন সকালে বাঘমারার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। দুইদিন দুই রাত কখনো হেটেঁ কখনো খোলা মাঠে বিশ্্রাম নিয়ে পাহাড়ী দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এলেঙ্গা বাজার, মহাদেও , বেতগড়া, রংরা বাজার ও ফান্ডা বাজার পাড়ি দিয়ে বাঘমারা ক্যাম্পে পৌছা। বাঘমারা ক্যাম্পে মহিষখলা থেকে অনেকটা স্বাছন্দ লাগলো। অনেক পরিচিত মুখ দেখতে পেলাম। দু একদিন পর বাবা ও নিতাই কাকা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাতের আধাঁেরে ক্যাম্প থেকে চলে গেলেন। সেই যে বাবার শেষ বিদায় আজো বাবার মুখ দেখতে পারিনি।পরে মা’র মুখে শুনতে পেলাম বাবা সীমান্তে প্রশিক্ষণ শেষ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। দেশ স্বাধীন হলে বাড়িতে ফিরে এসে শুধু ধ্বংস্তুপ ছাড়া কিছুই দেখা যায়নি। ঘরের টিন থেকে শুরু করে বাশঁ, গাছ সবকিছু কেটে নিয়ে পুরো বাড়িটাই যেন স্মশান করে রেখেছে। শুধু যে আমাদের বাড়ি তা নয় পাড়ার প্রায় সকলেরই বাড়ি একই অবস্থা।অনেক সন্ধান করেও বাবার কোন খোঁজ পাচ্ছিলাম না। একদিন সকালে হযরত চাচা এসে বলল মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্থান বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাক বাহিনীর গুলিতে বাবা ও নিতাই
কাকা দুজনেই শহীদ হয়েছেন। মা যেন চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। সকলে এসে আমাদের সান্তনা দিতে লাগলো। অনেকেই বলছে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন এটাই বড় প্রাপ্তি। বড় প্রাপ্তির কাছে অতি প্রিয় মানুষকে হারিয়ে আমরা
যেন নির্বাক। দরজায় কড়া নেড়ে বিজয়ের ঘরে বিপ্লবের প্রবেশ। কড়া নাড়ার শব্দে বিজয়ের স্বপ্নটা হঠাৎ ভেঙ্গে গেল।ঘাড় ফিরিয়ে ঘুম ঘুম চোখে বিজয় জিজ্ঞেস করলো, কিরে! তুই এখানে কেন? বিপ্লব বলল দারুন একটা খবর আছে। ওঠ, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। কি খবর? খুলে না বললে বুঝব কিভাবে। বিপ্লব বললো, বলার জন্যই তো তোর কাছে আসা। রাজাকারের ছেলে উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনরে বিজয় দিবসের মাঠে প্রবেশ করতে দেয়নাই। মুক্তিযুদ্ধের সন্তানদের আন্দোলন বৃথা হয় নাই। আমরা যে গত কিছু দিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছি বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নজরে পড়েছে। হয়তো বা কোন বড় ধরনের সিদ্বান্তেই উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েও আমিন উদ্দিন আজ প্যারডে সালাম নিতে পারবে না। তার পরিবর্তে ইউএনও কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিজয় যেন লাফিয়ে উঠে! তুই কি সত্যি বলছিস বিপ্লব ? যে রাজাকারের জন্য আমার বাবার জীবন দিতে হলো ,শুধু বাবা নয় ,আরো অনেককে জীবন দিতে হলো , মা বোনদের ত্যাগ স্বীকার করতে হলো, সেই আজিজ রাজাকারের ছেলে আমিনের কাছ থেকে তাহলে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে? আহা! কি আনন্দ! যেন নতুন করে আজ আরেকটা বিজয় দেখতে পাচ্ছি। ঠিক বলেছিস বিজয়, এটা আমাদের নতুন প্রজন্মের বিজয়। যেখানেই দেশ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের দেখা যাবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা নতুন প্রজন্মের সন্তানের আমিন কে বিজয় দিবসের মাঠে অবাঞ্চিত ঘোষনা করেছিলাম বলেই আজ
এমনটা করা সম্ভব হলো।বিজয় বলল, আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে, কালকে সারাটা রাত ঘুমাতে পারিনি। মা বার বার ডাকার পরও আমি উঠতে পারিনি। কেন উঠব দেশদ্রোহী রাজাকারের হাত হতে মাকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা নিতে হবে। এটা আমি মেনে নিতে পারছিলামনা। তাইতো শুয়ে শুয়ে ৭১ এর শরনার্থী জীবনের কষ্টের কথা স্বপ্নে দেখছিলাম। আর শিহরে উঠছিলাম।
বিজয় বিছানা থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে সাদা পায়জামা আর লাল সবুজের পাঞ্জাবী পড়ে বিপ্লবকে নিয়ে মাঠের দিকে পা বাড়াল। মাঠ থেকে মাইকে ভেসে উঠলো “ আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালবাসি”।